
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ যারা জোগান, তাদের বাড়ি ফেরার পথ রঙিন হওয়ার কথা ছিল; অথচ সেই পথ ঢাকা পড়ছে কাঠের কফিনে। কি মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুকা বেলা, কি আফ্রিকার গহিন প্রান্তর— নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান মেলেনি কোথাও। বিশেষ করে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা যেন রূপ নিয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর উপত্যকায়। প্রতিটা দিন সেখানে কাটছে আতঙ্ক, ছিনতাই ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার শঙ্কা নিয়ে। মুঠোফোনের স্ক্রিনে ছেলের মৃত্যু, দুই দশক পর এলো বাবার লাশ ফেনীর দাগনভূঞার তাহমিনা আক্তারের কাছে বাবার স্মৃতি একেবারেই আবছা। ৬ বছর বয়সে তাকে রেখে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন জসিম উদ্দিন। বৈধ কাগজপত্রের অভাবে দুই দশক ধরে দেশে ফেরা হয়নি তার। গত ১৭ জুলাই জোহানেসবার্গে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। তাহমিনার আক্ষেপ, ‘আমার ছোট বোনের বয়স এখন ১৮ বা ১৯, সে তো জীবনে বাবাকে দেখেইনি অন্যদিকে, নোয়াখালী সদরের হনুফা খাতুনের ট্র্যাজেডি আরও মর্মান্তিক। ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা ছিল ছেলে ইয়াসিনের। কিন্তু মুঠোফোনে কথা বলা অবস্থাতেই ভিডিও কলে তিনি দেখেছেন ছেলেকে গুলি করে হত্যার সেই ভয়াবহ দৃশ্য।হনুফা খাতুনের সেই অপেক্ষার প্রহর এখন শুধুই ডুকরে কাঁদার।
দক্ষিণ আফ্রিকা: যেখানে জীবনের চেয়ে বুলেটের দাম কম বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশির বসবাস। দেশটিতে অপরাধের সূচক ৭৪.৬-এ গিয়ে ঠেকেছে, যার কারণে খোদ যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ভ্রমণের ওপর সতর্কতা জারি করে রেখেছে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্যমতে, গত সাত মাসেই অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডাকাতি, রাস্তায় ছিনতাই কিংবা বাংলাদেশিদের নিজেদের মধ্যকার ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব— এসব কারণেই মূলত প্রাণ যাচ্ছে প্রবাসীদের। প্রিটোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শাহ আহমেদ শফী স্বীকার করেছেন, ‘সেখানে নিরাপত্তাজনিত সংকট অত্যন্ত তীব্র। গত পাঁচ বছরে অন্তত দুই শতাধিক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত। ভাষাগত দূরত্ব এবং আইনি জটিলতার কারণে এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার-ই পান না ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। জীবনের ঝুঁকি এড়াতে অনেকেই এখন সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরে আসছেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা-ই নয়, সারা বিশ্বেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা চরম উপেক্ষিত। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সাধারণ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে তিন থেকে চার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির মৃতদেহ দেশে ফেরে।
মধ্যপ্রাচ্য: সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা আরব আমিরাত থেকে আসা লাশের বেশিরভাগের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা থাকে ‘স্ট্রোক’, ‘হৃদরোগ’ বা ‘কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা’। অমানবিক পরিশ্রম ও প্রতিকূল পরিবেশই যে এর মূল কারণ, তা নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান তদন্ত নেই। পাশ্চাত্য: যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দেশগুলোতে মাঝে মাঝেই বর্ণবাদী হামলা বা ডাকাতির শিকার হয়ে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর আসে। আফ্রিকা: মধ্যপ্রাচ্যে মৃত্যুর কারণ যেখানে ‘দুর্ঘটনা বা রোগ’ হিসেবে উঠে আসে, দক্ষিণ আফ্রিকায় সেটি সরাসরি ‘হত্যাকাণ্ড’।
রাষ্ট্রের উদাসীনতা ও আইনি প্রহসন: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিতে রাষ্ট্রের চরম অবহেলা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে সেখানকার আইনি সংস্থাগুলোকে আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে নিযুক্ত করতে হবে। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, প্রবাসীদের আইনি সহায়তা দিতে সরকার ইতোমধ্যে বিশ্বের ১২টি দেশে ‘ল ফার্ম’ নিয়োগ দিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে এটি আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু বাস্তবতার ফাঁকফোকর হলো— সরকারের এই সহায়তা শুধু ‘বৈধ’ কাগজপত্র থাকা প্রবাসীদের জন্যই প্রযোজ্য। জসিম উদ্দিনের মতো যারা দুই দশক ধরে বৈধতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর তাদের লাশের দায়ভার নিতেও যেন রাষ্ট্রের চরম অনীহা রয়েছে। রেমিট্যান্সের টাকায় যখন রিজার্ভ ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের কাছে ওই প্রবাসীর বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু মৃত্যুর পর আইনি সহায়তার বেলায় এই বৈষম্য কতটুকু যৌক্তিক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 
























