
স্টাফ রিপোর্টারঃ শফিকুল ইসলাম (জামালপুর)
জামালপুরের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে গর্ভের পানির মারাত্মক স্বল্পতা থাকা এক গর্ভবতী রোগীর সিজার এবং জন্মের পরপরই নবজাতককে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অপারেশনের সময় রোগীর সঙ্গে অমানবিক আচরণের অভিযোগও করেছেন স্বজনরা।
অভিযোগকারী পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, রোগী গর্ভাবস্থায় মাদারগঞ্জের আল-তাসরিফ জেনারেল হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়েছেন ডা. রাবেয়া বসরী। সেখানে প্রায় ৫ থেকে ৬ বার তার আল্ট্রাসনোগ্রাম ও চেকআপ করা হয়। গত ১৫ জুলাই ২০২৬ সকাল ১১টার দিকে গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কম অনুভূত হলে, মাদারগঞ্জের নতুন দেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আবারও আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। সেখানে জানানো হয়, গর্ভের পানির মারাত্মক স্বল্পতা রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
পরবর্তীতে ঐ দিনই বিকেল ৪ টার দিকে রোগীকে জামালপুর ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কারণ, সেখানেই সেদিন ডা. রাবেয়া বসরী রোগী দেখতেছিলেন। পরিবারের দাবি_ ভর্তির পর সেখানে আবারও আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয় এবং রাত ৮টার দিকে রোগীর সিজার অপারেশন করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, সিজারের পর নবজাতকের ওজন ছিল ১ কেজি ৭০০ গ্রাম। অথচ প্রতিবারই পূর্বের রিপোর্টে বাচ্চার ওজন ও পানির কথা স্বাভাবিক ছিলো বলা হয়েছে (যেহেতু আগে কখনোই কোন সমস্যার কথা জানাননি)। অতঃপর জন্মের পরপরই নবজাতক শিশুটিকে জামালপুর সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরে সদর হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ১৬ জুলাই রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে নবজাতক শিশুটি মারা যায়। এ ঘটনায় রোগীর ভাই সাহেল করিম গত ১৯ জুলাই ২০২৬ জামালপুর সিভিল সার্জনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের একটি কপি মাদারগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের কাছে পৌঁছালে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে চিকিৎসক ডা. রাবেয়া বসরীর বক্তব্য জানতে গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ মাদারগঞ্জের আল-তাসরিফ জেনারেল হাসপাতালে গেলে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়নি। বরং সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চড়াও হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে ১৬ আগস্ট জামালপুর ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে চাইলে, সেখানেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘ম্যাডাম অনেক ব্যস্ত, তিনি দেখা করতে পারবেন না।’
এদিকে, অভিযোগের মূল প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে AFI মাত্র ২ সেন্টিমিটার থাকার পরও কেন নবজাতকের উন্নত চিকিৎসা বা NICU সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে আগে রেফার না করে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালেই সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
অভিযোগকারী পরিবারের প্রশ্ন, যদি নবজাতকের জন্মের পরপরই উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে সিজারের আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে রোগীকে NICU সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে রেফার করা হলো না কেন?এছাড়া অপারেশনের সময় রোগীর সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়েছে। রোগী বলছে ‘বমি আসছে,, ডাক্তার ধমকের সুরে জবাব দিয়েছে_ বমি গিলে খাও’—এ ধরনের কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
পরিবারের আরও অভিযোগ, সিজারের মতো স্পর্শকাতর মুহূর্তে রোগী যখন আল্লাহর নাম ও দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন, তখন কর্মরত চিকিৎসক ডা. রাবেয়া বসরী তা নিয়ে উপস্থিতিদের সামনে কটাক্ষ করে বলেন, ‘রোগী আবার গানও গায়।’ এমন মন্তব্য একজন চিকিৎসকের পেশাগত আচরণ এবং রোগীর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এখন সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
এদিকে, নবজাতকের মৃত্যুর পর রোগীর সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন হয়ে সেখান থেকে পানি বের হওয়ার অভিযোগও করেছে পরিবার।
পরিবারের দাবি, গত ৭ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার ডা. রাবেয়া বসরী আল-তাসরিফ হাসপাতালে রোগী দেখার সময় সেলাইয়ের জায়গায় একটি পাইপ লাগিয়ে দেন। একই সঙ্গে মাঝেমধ্যে আল-তাসরিফ হাসপাতালে এসে ড্রেসিং করিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ আগস্ট রোগী ড্রেসিং করাতে গেলে, প্রথমে আল তাসরিফ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ড্রেসিং করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ পরিবারের। তাদের দাবি, তখন বলা হয়—‘বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা আমাদের কী করতে পারবে?’ পরে রোগীকে আবার হাসপাতালে পাঠানো হলে ড্রেসিং করা হয়। গত ২২ আগস্ট রোগীর সেলাই খুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
ঘটনার বিষয়ে গত ১৬ আগস্ট জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুল হকের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, অভিযোগটি উনি ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে পেয়েছেন। ব্যস্ততার কারণে এ বিষয়ে সময় দিতে পারেননি। তবে তিনি তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, চিকিৎসক ডা. রাবেয়া বসরীর বক্তব্য জানতে গত ২০ আগস্ট মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে কোনো তথ্য দেব না, আমি যেখানে তথ্য দেওয়ার সেখানেই দেব।’ পরে তিনি আরও বলেন, ‘এ অভিযোগের বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।
তবে ডা. রাবেয়া বসরী অভিযোগগুলো স্বীকার বা অস্বীকার করেননি; তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর সিভিল সার্জনও অভিযোগটি তদন্ত করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
এখন অপেক্ষা তদন্তের। চিকিৎসা-সিদ্ধান্তে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা ঐ হাসপাতালে ছিল কি না এবং রোগীর স্বজনদের করা অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা কী—তদন্তেই মিলতে পারে এসব প্রশ্নের উত্তর।
প্রতিবেদকের নাম 



















