
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গাবতলী থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার যাচ্ছে ‘অছিম পরিবহন’। পেছনে চারপাশ অন্ধকার করে ঘন কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে পুরো সড়ক। ওই বাস আশপাশের সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ অন্য পরিবহনের যাত্রীদের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শুধু এই অছিম বাসই নয় প্রতিনিয়ত ঢাকার রাস্তায় শত শত ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাসের কালো ধোঁয়ায় ফুসফুস ঝাঁঝরা হচ্ছে রাজধানীবাসীর। এই কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। একইসঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন নগরবাসী। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসরা বলছেন ধোঁয়ায় থাকা কার্বন পার্টিকেল থেকে মানুষের অ্যাজমা হাঁপানি ব্রংকাইটিসসহ ফুসফুসের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। অছিম পরিবহনের কালো ধোঁয়ার ভুক্তভোগী মোটরসাইকেল চালক মো আব্দুল কাদের বলেন কালো ধোঁয়ার মধ্যে পড়ে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ ব্রেক কষে থামতে হয়েছে। পেছন থেকে কোনো গাড়ি ধাক্কা দিতে পারতো। বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছি। তিনি আরও বলেন বাসের কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, এখন বমি বমি লাগছে। আব্দুল কাদের আরও বলেন, রাজধানীর বেশির বাসেরই ফিটনেস নেই কালো ধোঁয়া ছাড়ে, ভাঙ্গা-চোরা, লক্কড়-ঝক্কড়। বিআরটিএ, পুলিশ-প্রশাসন কেউ এসব ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। তারা দেখেও দেখে না। বাসযাত্রী আব্দুর রহমান বলেন, বাসগুলো প্রচন্ড কালো ধোঁয়া ছাড়ে দম বন্ধ হয়ে আসে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে এই বিষাক্ত বাতাস নিতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু কি করব নিরুপায় হয়ে যাতায়াত করতে হয়। স্কুলছাত্রী ফারিশতা ফেরদৌস নূহার মা শিবলী হাসান মিতু বলেন স্কুলে যাওয়ার সময় ধুলাবালি গাডড়র শব্দ ও গাডড়র কালো ধোঁয়ার কারণে প্রায়ই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মুখে মাস্ক পরিয়ে নিয়ে যাই তারপরও শ্বাসকষ্টে ভুগছে অ্যালার্জি অ্যাজমা লেগেই আছে। রাস্তায় বের হলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন যেসব গাডড়র ফিটনেস নেই সেগুলোর রাস্তায় চলাচল একদম বন্ধ হওয়া উচিত। রাস্তায় চলাচলের সময় সবারই জীবনের নিরাপত্তা থাকা দরকার। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ কোনো ব্যবস্থা নেবে না বন্ধও করবে না। যাদের দায়িত্ব তারা বিষয়গুলো দেখবে না। এই অভিভাবক বলেন, ডাক্তারের কাছে গেলে একটাই পরামর্শ দেয়– বাচ্চাদের বাইরে বের করার সময় মাস্ক পরাতে হবে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেশি বের করা যাবে না, ধোঁয়া ধুলাবালি থেকে দূরে রাখতে হবে। কিন্তু এভাবে তো জীবন চলতে পারে না। হঠাৎ ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতে কাপড় বিক্রেতা মো. আবুল কাশেম (৬০)। তিনি বলেন বিগত ১৭ ধরে রাজধানীর ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করে আসছি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম পরে তিনি জানালেন আপনার তো ফুসফুসের সমস্যা হয়েছে রাস্তার ধুলা ময়লা, গাডড়র কালো ধোঁয়ার কারণে এ সমস্যাগুলো দেখা দিয়ে থাকে। আবুল কাশেম আরও বলেন ডাক্তার আমাকে ধুলাবালি ও গাডড়র কালো ধোঁয়া থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
কিন্তু পরিবারে পাঁচ সদস্য ব্যবসা না করলে সংসার চলবে না। ঢাকার এই পরিবেশের কারণে এখন আমার জীবন ঝুঁকিতে। এর জন্য কার কাছে বিচার দেব। এ বিষয়ে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক চিকিৎসক ফুসফুস ও রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (পালমোনোলজিস্ট) অধ্যাপক বিশ্বাস আখতার হোসেন বলেন গাডড়র কালো ধোঁয়ায় কার্বন পার্টিকেল থাকে। এই পার্টিকেল থেকে মানুষের অ্যাজমা হাঁপানি ব্রংকাইটিস ও সিওপিডিসহ ফুসফুসের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এতে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং নানারকম জটিলতা দেখা দেয়। একবার ক্যান্সার হয়ে গেলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন যারা রাস্তাঘাটে বেশি চলাচল করেন বা কাজ করেন কালো ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকেন তাদের ফুসফুস আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়। ফুসফুস এক প্রকার প্যারালাইসড বা হ্যান্ডিক্যাপড হয়ে পড়ে। তখন রোগী বেঁচে থাকলেও আর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা থাকে না তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং মানুষের আয়ু কমে যায়। ঢাকা শহরে গাডড়র কালো ধোঁয়ার চেয়ে ক্ষতিকর জিনিস আর কিছু নেই। অধ্যাপক বিশ্বাস আখতার হোসেন বলেন এমনিতেই ঢাকা শহরে ধুলাবালি সিগারেটের ধোঁয়া ও নানা অপরিচ্ছন্নতার কারণে বায়ুদূষণ লেগেই থাকে। তার ওপর যখন এই কালো ধোঁয়া বাতাসে মেশে তখন দূষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। তিনি আরও বলেন আমাদের দেশে গাডড়র ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা শুধু কাগজ-কলমেই আছে বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই। লাখ লাখ ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাডড় রাস্তায় চলছে। কিন্তু কোনো সংস্থা এগুলো দেখভাল করছে না।
ফলে পুরো ঢাকা শহর কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে, মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি বাডড়য়ে দিচ্ছে। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ একটি বিরাট সমস্যা। এর ফলে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। তিনি বলেন বায়ুদূষণের কারণগুলো সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। একসময় এর সিংহভাগের জন্য ইটভাটাগুলোকে দায়ী করা হতো। পরে মেগা প্রজেক্ট (যেমন– মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভার) নির্মাণের সময় কনস্ট্রাকশন সাইটগুলো দূষণের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। তবে একটি কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুদূষণের জন্য দায়ী আর তা হলো– রাস্তাঘাটে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন। রাজনৈতিক সখ্য ও মালিকানা পরিবর্তনের কারণে এগুলো বছরের পর বছর বেআইনিভাবে ঢাকা শহরে চলছে। শহরের বায়ুদূষণ দূর করতে ও নগরবাসীকে এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে মুক্ত করতে কেবল গাডড় উঠিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে বলে জানান এই পরিবেশকর্মী।
এদিকে প্রতিদিন ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া উডড়য়ে যানবাহন চলাচল করলে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। অথচ রাস্তায় কালো ধোঁয়া ছড়লে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় গাডড় ডাম্পিংয়ে পাঠানোর বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে গুলশান ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মোহম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন গাবতলী ও মিরপুর থেকে রামপুরা টিভি সেন্টারের দিকে চলাচলকারী বাসগুলোর কালো ধোঁয়া ও জরাজীর্ণ অবস্থার বিরুদ্ধে গত সাত দিন ধরে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। গাডড়গুলো পরীক্ষা করে মামলা দেওয়া হচ্ছে ও পরিবেশ আইনসহ বিভিন্ন ধারায় বড় অঙ্কের জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। তিনি বলেন শুধু মামলাই নয় যেসব বাস চলাচলের অযোগ্য লক্কড়-ঝক্কড় কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ সেগুলো যাতে স্থায়ীভাবে স্ক্র্যাপ (ভেঙে ফেলা) করা হয় সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে বিআরটিএ বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 























