
ময়মনসিংহ,জেলা প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুর গ্রামে এখন নদীর শব্দ মানেই আতঙ্ক। কখন যে ভিটের মাটি সরে যাবে, কখন ঘরবাড়ি নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে হারিয়ে যাবে শেষ সম্বল, সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। গত দুই বছরে প্রায় দেড়শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চলতি বছরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। তাদের দাবি, ভাঙতে ভাঙতে গ্রামের প্রায় অর্ধেকই এখন ব্রহ্মপুত্রের বুকে। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায় আজ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) খোদাবক্সপুরে গিয়ে দেখা যায়, নদ ঘেঁষা বাড়িগুলোতে যেন নেমে এসেছে অদৃশ্য এক আতঙ্ক। কোনো বাড়ির উঠান থেকে নদী মাত্র কয়েক হাত দূরে। কোথাও আবার ঘরের কাছেই ভাঙনের ক্ষত। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো ঘরের আসবাব, চাল-ডাল, টিনসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কারও চোখে ঘর হারানোর ভয়, কারও চিন্তা নতুন করে কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। কেউ কেউ অবশ্য আর অপেক্ষা করছেন না। নদের ওপারে জেগে ওঠা চরে নতুন করে ঘর তুলেছেন। এক জীবনে বারবার ঘর হারিয়ে আবার ঘর তোলার এই গল্প যেন খোদাবক্সপুরের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। গ্রামের আবদুল মান্নানের বাড়ি এবার নিয়ে পঞ্চমবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে তার বাড়ির দুটি ঘর নদে ভেঙে পড়েছে। একসময় ২০ একর জমির মালিক ছিলেন তিনি। নদী কেড়ে নিয়েছে সব। কথা বলতে গিয়ে যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্ট বেরিয়ে আসে আবদুল মান্নানের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘২০ একর জমিন ছিল, সবই শেষ। বাড়ি আর কত ভাঙব, আর কতবার বানবাম? ১৯৮৮ সালের পর থেইকা আমরার এলাকা ভাঙতাছে।’
একজন মানুষের জীবনে পাঁচবার বাড়ি ভাঙার অর্থ শুধু টিন-খুঁটি-চাল হারানো নয়। প্রতিবারের সঙ্গে হারিয়ে যায় পরিচিত উঠান, গাছপালা, জমি আর ঘিরে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। আবদুল মান্নানের দুই ছেলের বাড়িও নদে বিলীন হয়েছে। এখন তারা নদের ওপারের চরে নতুন করে বসতি গড়েছেন। সোহেল রানার পরিবারের গল্পও খুব আলাদা নয়। এর আগে তিনবার তাদের বাড়ি নদে ভেঙেছে। এবার ভিটায় থাকা আটটি ঘরই ঝুঁকিতে। এরই মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ কাঠা কৃষিজমি নদে বিলীন হয়েছে। যে জমিতে একসময় ফসল ফলত, যে ভিটায় পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন, সেই জায়গাটিই এখন তাদের কাছে অনিশ্চিত। নদীর দিকে তাকালেই মনে হয়, আর কতটুকু বাকি? স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানো গেলেও এতে স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের দাবি, খোদাবক্সপুরকে বাঁচাতে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। না হলে একের পর এক পরিবারকে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, গৌরীপুরের খোদাবক্সপুর, ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচরসহ সদর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ২৭০ মিটার এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরেও জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করা হচ্ছে। কয়েকটি পরিবারকে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য পাউবোর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নদীভাঙনের অন্যতম কারণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। গত তিন মাসে দুটি অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। তবু খোদাবক্সপুরের মানুষের ভয় কাটছে না। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, নদী থেমে থাকে না। আজ যে ভিটায় দাঁড়িয়ে কথা বলা যাচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো থাকবে না। আবদুল মান্নানের প্রশ্নটাই যেন পুরো গ্রামের মানুষের প্রশ্ন- ‘বাড়ি আর কত ভাঙব, আর কতবার বানবাম?’ এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি পরিবারের নয়। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভিটেমাটি হারাতে থাকা খোদাবক্সপুরের প্রতিটি মানুষের ভবিষ্যৎ এই উত্তরের ওপর নির্ভর করছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















