
নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, মানুষের স্বাধীনতার জন্য। জীবনের এই শেষ সময়ে এসে কোনো ভাতা কিংবা সরকারি সুযোগ-সুবিধা চাই না। শুধু চাই, রাষ্ট্র যেন আমাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাহলে মৃত্যুর পরও আমার সন্তানরা গর্ব করে বলতে পারবে-তাদের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
আবেগঘন কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা এবং বর্তমানে বরিশাল নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাজার টেম্পুস্ট্যান্ড এলাকায় বসবাসরত সুভাস চন্দ্র বসু। বয়স প্রায় ৮০ ছুঁইছুঁই। বার্ধক্য ও শারীরিক নানা জটিলতায় আজ তিনি অনেকটাই শয্যাশায়ী। তবুও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনবাজি রেখে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন সুভাস চন্দ্র বসু। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিশেষ নজরদারি ও ঝুঁকির মধ্যেও তিনি যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছু হটেননি। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি নিজের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে যুদ্ধ করেছেন বিভিন্ন এলাকায়।
সুভাস চন্দ্র বসুর পরিবার জানায়, যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ফিরে এলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি নীরবে জীবনযাপন করেছেন। কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা আর্থিক লাভের আশায় নিজেকে সামনে আনেননি। তবে জীবনের শেষ সময়ে এসে তার একমাত্র চাওয়া-রাষ্ট্র যেন তাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেন সুভাস চন্দ্র বসু। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণসহ নতুন করে আবেদন জমা দেওয়া হয়।
আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নথির মধ্যে রয়েছে-১) অনলাইনকৃত আবেদনপত্র (ডিপি নং- ১২৬৮০৬৩),২) জেলা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্র,৩) থানা কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্র,৪) বিডিআর সদস্য শাহ কর্তৃক প্রদানকৃত প্রশিক্ষণ সনদপত্র,৫) ইউনিয়ন কমান্ডারের প্রত্যয়নপত্র,৬) পক্ষে সন্তান উৎপল বসুর ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র।
এছাড়াও যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধা হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন মো. আ. আউয়াল, মো. আতাউর রহমান, মো. শাহজাহানসহ একাধিক ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকে সুভাস চন্দ্র বসুর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আপিল করতে বিলম্ব হওয়ার পেছনেও ছিল বাস্তব ও মানবিক কারণ। একদিকে নিজের জরুরি চিকিৎসাজনিত কারণে দেশের বাইরে অবস্থান, অন্যদিকে তার মায়ের ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এসব কারণেই সময়মতো প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
সুভাস চন্দ্র বসুর একাধিক স্বজন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, তিনি কখনো টাকার জন্য যুদ্ধ করেননি। এখনো কোনো ভাতা বা আর্থিক সুবিধার দাবি করছেন না। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়াটাই তার জীবনের শেষ চাওয়া। তিনি আজ মৃত্যুশয্যায়। আমরা চাই, জীবিত অবস্থাতেই তিনি যেন এই স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেন।স্থানীয় সচেতন মহলও মনে করছেন, একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তারা বলছেন, জমা দেওয়া কাগজপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সুভাস চন্দ্র বসুকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা উচিত।
তাদের মতে, এটি শুধু একজন মানুষের স্বীকৃতির বিষয় নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুভাস চন্দ্র বসুর একটাই আকুতি-স্বাধীনতার জন্য যে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র যেন তাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যেন মৃত্যুর আগে অন্তত এই তৃপ্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করতে পারেন যে, তার আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি।
প্রতিবেদকের নাম 

























