
রাঙামাটি প্রতিনিধিঃ পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত। অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মেঘ-পাহাড়ের মিতালী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে এই অঞ্চলে পাহাড়কেন্দ্রিক পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে একই সঙ্গে এটি অস্থিতিশীল নিরাপত্তা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো তীব্র সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত। অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলের পর্যটন খাত বিভিন্ন কাঠামোগত, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
রাঙামাটির কাপ্তাই লেক ও ঝুলন্ত ব্রিজ, খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও সাজেক ভ্যালি এবং বান্দরবানের নীলাচল, নীলগিরি ও বগালেক আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোর বেশিরভাগই বান্দরবানে অবস্থিত। ফলে তরুণ ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে ট্রেকিং, হাইকিং এবং মাউন্টেন বাইকিংয়ের বিশাল বাজার তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, উৎসব এবং ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও পোশাক পর্যটকদের জন্য অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। স্থানীয়ভাবে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নৌ-পরিবহন ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পাহাড়ের অর্থনীতিকে চাঙা করছে।
পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে এখানকার আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা, হঠাৎ ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। মেঘের রাজ্যে পর্যটনের হাওয়ামেঘের রাজ্যে পর্যটনের হাওয়া: যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো ছাড়া দুর্গম পাহাড়ের রাস্তাঘাট এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুন্নত। সরাসরি উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় এবং পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও ঢালু রাস্তায় যাতায়াত করতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ লাগে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায়ই পাহাড় ধস ঘটে এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুর্গম অঞ্চলের রাস্তাঘাট এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বনায়ন ধ্বংস এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে।
মৌসুমি পানির অভাব ও অন্যান্য সংকট
কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বর্ষায় রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু মাসের পর মাস ডুবে থাকে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের অনেক এলাকায় তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়, যা পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবনকেও দুর্বিষহ করে তোলে এবং পর্যটন খাতের সুফল স্থানীয়দের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা মনে করছেন, পাহাড়ে টেকসই ও পরিকল্পিত পর্যটন গড়ে তুলতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিবেশ রক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়াতে হবে।
ঝরনায় পর্যটকদের বিচরণঝরনায় পর্যটকদের বিচরণ বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হাওয়ায় পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটক ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার। মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালি, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, ঝুলন্ত সেতু কিংবা সুবলং ঝরনা দেশের ভ্রমণপিপাসুদের সবসময়ই আকর্ষণ করে। তবে সাজেকে সারা বছর পর্যটক থাকলেও রাঙামাটিতে শহরকেন্দ্রিক নতুন বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হাওয়ায় পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে জেলা পরিষদ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এগিয়ে আসলে নতুন নতুন উদ্যোক্ত তৈরি হতো। পর্যটন উদ্যোক্তা নূর তালুকদার মুন্না বলেন, ‘ছুটির দিন ও শীতের মৌসুমে পাহাড়ে ভ্রমণকারী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তি থাকে। আশার বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ট্রেকিং ও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে সেভাবে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।
কাপ্তাই হ্রদের বুকে অবস্থিত মায়াবী দ্বীপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক হেফাজত সবুজ বলেন, ‘পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় অনেক ঝরনা আছে; শুধু সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা গেলে বর্ষা মৌসুমে রাঙামাটির প্রাকৃতিক ঝরনাগুলোতে পর্যটকদের সমাগম বাড়তো। এখন পর্যটকরা হোটেলে থাকার চেয়ে রিসোর্ট ও হাউসবোটগুলোতে বেশি থাকতে চান। তাদের জন্য আমরাও চেষ্টা করছি বিনোদনের। পর্যটকদের কেন্দ্র করে বহু টেক্সটাইল দোকান, ট্যুরিস্ট বোট ও ভাসমান দোকানের মাধ্যমে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় শৃঙ্খলা আনা গেলে পর্যটকদের হয়রানি কমে আসবে। তাতে ভবিষ্যতে পর্যটকদের সমাগম থাকবে সারা বছর। ঈদ কিংবা ছুটির দিনে পর্যটকে মুখর থাকে রাঙামাটি। কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝরনা, সাজেকসহ জেলার নানা পর্যটনকেন্দ্রে ঘোরেন তারা। রাঙামাটিতে পর্যটকদের আকর্ষণ ঝরনারাঙামাটিতে পর্যটকদের আকর্ষণ ঝরনা
দরকার কমিউনিটিভিত্তিক ট্যুরিজম: রাঙামাটি রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুবেধ চাকমা বলেন, ‘স্থানীয় সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে কমিউনিটিভিত্তিক ট্যুরিজম গড়ে তোলা হলে রাঙামাটিতে সারা বছর পর্যটক আসবে। তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে ঋণ দিলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতো। রাঙামাটিতে যেসব রিসোর্ট বা হাউসবোট আছে, সেগুলো ব্যক্তি উদ্যোগ তৈরি করা। এভাবে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। যদি না সহযোগিতা পাওয়া যায়। এজন্য সরকারি উদ্যোগও প্রয়োজন আছে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পর্যটন শিল্পকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, সে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। জেলা পরিষদ, রিসোর্ট মালিক ও ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই আমরা। যাতে নতুন উদ্যোক্তাদের পাশে থাকতে পারি।
প্রতিবেদকের নাম 


















