
এম নজরুল ইসলাম খান
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ—এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। শিক্ষাকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত এবং শিক্ষার্থীর কাছে সহজবোধ্য করা যায়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে নানা গবেষণা। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষার আঙিনায় একটি আধুনিক শিক্ষাদর্শন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে—তা হলো ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষা। একজন শিক্ষক এবং সংবাদকর্মী হিসেবে শিক্ষার এই আধুনিকীকরণকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যাঞ্জক একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ এবং বিদগ্ধ শিক্ষাবৃন্দের কাছে এই রূপান্তরের মূল ভাবনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরাই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
দর্শনের নাম ‘হ্যাপিনেস’: আনন্দময় শিক্ষার শুভ সূচনা-
প্রথমেই আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মূল ধারার জাতীয় শিক্ষাক্রমে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে হুবহু কোনো স্বতন্ত্র বা পৃথক আবশ্যিক পাঠ্যবই চালু হয়নি। তবে যা যুক্ত হতে যাচ্ছে, তার অন্তর্নিহিত দর্শন এটাই। প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষণ-শেখানো প্রক্রিয়াকে আনন্দময় করার জন্য একটি বিশেষ গাইডলাইন ও দর্শন নিয়ে কাজ করছে সরকার।
চিরাচরিত মুখস্থবিদ্যার চাপ কমিয়ে খেলাধুলা, গল্প, অভিজ্ঞতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিশুকে শেখানোই এই দর্শনের মূল কথা। যেহেতু এই প্রক্রিয়াটি, এর মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণীকক্ষের চূড়ান্ত কার্যক্রমগুলো এখনো নীতিগত পর্যায় ও পূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে, তাই একে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় রূপান্তর হিসেবে দেখতে হবে।
বইয়ের পাতায় গল্পের মোড়ক ও মানবিক মূল্যবোধ
নতুন এই শিক্ষাদর্শনে বইয়ের অধ্যায়গুলো সাজানো হচ্ছে বাস্তব জীবনের নানা চমৎকার গল্প ও অভিজ্ঞতার আলোকে। বিভিন্ন আকর্ষণীয় চরিত্র ও কমিকসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বয়সোপযোগী নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেমন: আবেগ ও মানসিক স্বাস্থ্য:* কীভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে সহপাঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়।
মূল্যবোধ ও নৈতিকতা: সততা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য।
প্রকৃতি ও পরিবেশ: তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে গিয়ে চারপাশের পরিবেশকে ভালোবাসার ব্যবহারিক পাঠ।
এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও যুগোপযোগী চিন্তা, যা আমাদের শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শ্রেণীকক্ষের কার্যক্রম: চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
এই শিক্ষাদর্শনের সবচেয়ে আধুনিক দিকটি হলো প্রথাগত ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। তার বদলে জোর দেওয়া হচ্ছে ‘ধারাবাহিক মূল্যায়ন’ বা সারা বছর ক্লাসে শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর যেহেতু এই মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণীকক্ষের সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমগুলো এখনো চূড়ান্ত পরিমার্জন ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এর প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছেন। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি তৈরিতে কাজ করছেন যা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীর মেধার সঠিক মূল্যায়ন করবে, অন্যদিকে
পড়াশোনাকে করে তুলবে উৎসবমুখর।
শিক্ষক সমাজের প্রস্তুতি ও দক্ষতা উন্নয়ন
যে কোনো নতুন শিক্ষাদর্শনের সফল বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকা অগ্রগণ্য। যেহেতু ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কোনো আলাদা সাবজেক্ট নয়, তাই এই নামে কোনো আলাদা শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে না।
বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরই এই “আনন্দময় শিক্ষা” বা “অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম” পরিচালনার জন্য সরকার বিভিন্ন ইন-সার্ভিস ট্রেনিং (In-service Training) ও বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসছে। প্রশাসন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে শিক্ষকদের এই নতুন ধারার সাথে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার সাথে সাথেই শিক্ষকেরা তা ক্লাসরুমে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।
শিক্ষিত ও শিক্ষাবৃন্দের প্রতি আহ্বান
শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং একে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকীকরণ করা যে কোনো প্রগতিশীল রাষ্ট্রের লক্ষ্য। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, “কোনো শিশুকে জোরপূর্বক জ্ঞানার্জনে বাধ্য করো না; বরং তার আগ্রহের জায়গাকে আনন্দের মাধ্যমে উস্কে দাও।” বাংলাদেশ সরকার আজ যে আনন্দময় শিক্ষার পথ তৈরিতে কাজ করছে, তার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ ও দূরদর্শী।
যেহেতু বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়নের পর্যায়ে রয়েছে, তাই দেশের শিক্ষিত সমাজ, অভিভাবক এবং বিদগ্ধ শিক্ষাবৃন্দের দায়িত্ব হলো একে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানানো এবং গঠনমূলক চিন্তার মাধ্যমে এর সফল বাস্তবায়নে অংশীদার হওয়া। আমাদের সম্মিলিত সহযোগিতা ও প্রশাসনের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে প্রকৃত ‘হ্যাপিনেস’ বা আনন্দের আলো ছড়িয়ে পড়বে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
(লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক)
প্রতিবেদকের নাম 

























