Dhaka ০৫:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বাঁশখালীতে বনভূমি উদ্ধারে গিয়ে হামলা, বনকর্মী ও পুলিশসহ আহত ৬ পানি ছাড়লেও মাছশূন্য কালভার্ট এলাকা,টাঙ্গন নদীতে অবাধ্য রিং ও কারেন্ট জালের কারণে। ধামরাইয়ে ফ্যামিলি কার্ডের জরিপ কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন ইউএনও বদলগাছীতে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ৮ হাজার কেজি চাল জব্দ আওয়ামী লীগের দখলে থাকা খেলার মাঠ এখন বিএনপির লোকজনের নিয়ন্ত্রণে: নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ধুনটে বৃক্ষরোপণ উপকূলীয় এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ চান স্পিকার পত্নীতলায় ওয়ারী গ্রামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু দেশের জন্যও শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে: এমপি এমরান চৌধুরী শ্রীপুরে সিএনজি ও টমটম মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত-১

কোরবানির ঈদ: মাংসের নয়, মনুষ্যত্বের উৎসব

এম নজরুল ইসলাম খান
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের মূল শিক্ষা কেবল পশু কোরবানি নয়; বরং আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও মহানুভবতার চর্চা। কোরবানির ঈদ মানুষকে শেখায় নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, স্বার্থপরতা ও পশুত্বকে জবাই করার শিক্ষা। তাই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য মাংসের পরিমাণে নয়, মানুষের হৃদয়ের উদারতায়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই কোরবানির ঈদ তার প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে ভোগ ও প্রদর্শনের উৎসবে পরিণত হচ্ছে। কার গরু কত বড়, কার কোরবানি কত দামী, কে কত বেশি মাংস সংরক্ষণ করতে পারল— এসব নিয়ে এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে বিনয়, ত্যাগ ও মানবতার শিক্ষা দিয়েছে।

কোরবানির ঈদ কখনোই মাংস জমিয়ে রাখার উৎসব হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত সমাজের বঞ্চিত, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর উৎসব। সমাজে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সারা বছর হয়তো ভালো খাবার জোটাতে পারেন না। কোরবানির ঈদ তাদের জন্য আনন্দ ও অংশীদারত্বের বার্তা নিয়ে আসে। তাই কোরবানির প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই মাংস সমাজের প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক সমাজ গঠন। আর এই মানবিকতার শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। একটি শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়ার শিক্ষা পেতে পারে; কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা সে প্রথমে পরিবার থেকেই পায়। তাই কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে শিশুদের ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগির শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমরা যদি শিশুদের শেখাই যে ঈদ মানে কেবল নতুন পোশাক, ভোজন বা আনন্দ নয়; বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর নামই প্রকৃত আনন্দ— তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও মানবিক হয়ে উঠবে। শিশুদের নিয়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে মাংস পৌঁছে দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করার সুযোগ তৈরি করা— এগুলোই হতে পারে এক মহান পারিবারিক শিক্ষা।

কোরবানির পশুর প্রতিও আমাদের আচরণ হওয়া উচিত সহানুভূতিশীল ও মমতাপূর্ণ। ইসলামে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই শিশুরা যেন পশুর যত্ন নিতে শেখে, তাকে ভালোবাসতে শেখে, তার প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করে— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের শিশুরা যদি কোরবানির পশুকে খাওয়ায়, গোসল করায়, আদর করে, তার সঙ্গে সময় কাটায়, তাহলে তাদের মনে সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ জন্ম নেবে। আর সেখান থেকেই তারা মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে।

আজকের পৃথিবীতে ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। মানুষ ধীরে ধীরে সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলছে। এই সময়ে কোরবানির ঈদ হতে পারে মানবিক পুনর্জাগরণের এক অনন্য সুযোগ। এই উৎসব আমাদের শেখায়— প্রকৃত মহত্ত্ব সম্পদে নয়, ত্যাগে; প্রকৃত বড়ত্ব প্রদর্শনে নয়, বিনয়ে; প্রকৃত আনন্দ একা ভোগে নয়, বরং অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ায়।

কোরবানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ভেতরের পশুত্বকে জয় করাই সবচেয়ে বড় ত্যাগ। যদি কোরবানির পরেও মানুষের আচরণে অহংকার, হিংসা, লোভ ও বৈষম্য থেকে যায়, তবে সেই কোরবানির আত্মিক সৌন্দর্য অপূর্ণ থেকে যায়। তাই কোরবানির শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে হবে।

আমাদের সমাজে যদি কোরবানির ঈদ সত্যিকার অর্থে মানবিকতার উৎসবে পরিণত হয়, তাহলে ধনী-গরিবের দূরত্ব কমবে, পারস্পরিক ভালোবাসা বাড়বে এবং সামাজিক সম্প্রীতি শক্তিশালী হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ নিজের আনন্দের পাশাপাশি অন্যের আনন্দের কথাও ভাবে।

আসুন, আমরা কোরবানির ঈদকে মাংসের উৎসব নয়, মনুষ্যত্বের উৎসবে পরিণত করি। আমাদের সন্তানদের শেখাই ত্যাগ, সহমর্মিতা, বিনয় ও ভালোবাসার শিক্ষা। কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য হোক মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তের মুখে আহার তুলে দেওয়া এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা।

তবেই কোরবানির ঈদ সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠবে মানবিকতার দীপ্ত এক মহোৎসব— যেখানে পশু কোরবানির পাশাপাশি মানুষ তার অহংকার, লোভ ও নিষ্ঠুরতাকেও কোরবানি দিতে শিখবে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

বাঁশখালীতে বনভূমি উদ্ধারে গিয়ে হামলা, বনকর্মী ও পুলিশসহ আহত ৬

কোরবানির ঈদ: মাংসের নয়, মনুষ্যত্বের উৎসব

আপডেটের সময়: ০২:০০:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

এম নজরুল ইসলাম খান
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের মূল শিক্ষা কেবল পশু কোরবানি নয়; বরং আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও মহানুভবতার চর্চা। কোরবানির ঈদ মানুষকে শেখায় নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার, স্বার্থপরতা ও পশুত্বকে জবাই করার শিক্ষা। তাই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য মাংসের পরিমাণে নয়, মানুষের হৃদয়ের উদারতায়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই কোরবানির ঈদ তার প্রকৃত তাৎপর্য হারিয়ে ভোগ ও প্রদর্শনের উৎসবে পরিণত হচ্ছে। কার গরু কত বড়, কার কোরবানি কত দামী, কে কত বেশি মাংস সংরক্ষণ করতে পারল— এসব নিয়ে এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে বিনয়, ত্যাগ ও মানবতার শিক্ষা দিয়েছে।

কোরবানির ঈদ কখনোই মাংস জমিয়ে রাখার উৎসব হতে পারে না। এটি হওয়া উচিত সমাজের বঞ্চিত, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর উৎসব। সমাজে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সারা বছর হয়তো ভালো খাবার জোটাতে পারেন না। কোরবানির ঈদ তাদের জন্য আনন্দ ও অংশীদারত্বের বার্তা নিয়ে আসে। তাই কোরবানির প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই মাংস সমাজের প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক সমাজ গঠন। আর এই মানবিকতার শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। একটি শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়ার শিক্ষা পেতে পারে; কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা সে প্রথমে পরিবার থেকেই পায়। তাই কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে শিশুদের ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগির শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমরা যদি শিশুদের শেখাই যে ঈদ মানে কেবল নতুন পোশাক, ভোজন বা আনন্দ নয়; বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর নামই প্রকৃত আনন্দ— তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও মানবিক হয়ে উঠবে। শিশুদের নিয়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে মাংস পৌঁছে দেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করার সুযোগ তৈরি করা— এগুলোই হতে পারে এক মহান পারিবারিক শিক্ষা।

কোরবানির পশুর প্রতিও আমাদের আচরণ হওয়া উচিত সহানুভূতিশীল ও মমতাপূর্ণ। ইসলামে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই শিশুরা যেন পশুর যত্ন নিতে শেখে, তাকে ভালোবাসতে শেখে, তার প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করে— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের শিশুরা যদি কোরবানির পশুকে খাওয়ায়, গোসল করায়, আদর করে, তার সঙ্গে সময় কাটায়, তাহলে তাদের মনে সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ জন্ম নেবে। আর সেখান থেকেই তারা মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে।

আজকের পৃথিবীতে ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। মানুষ ধীরে ধীরে সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলছে। এই সময়ে কোরবানির ঈদ হতে পারে মানবিক পুনর্জাগরণের এক অনন্য সুযোগ। এই উৎসব আমাদের শেখায়— প্রকৃত মহত্ত্ব সম্পদে নয়, ত্যাগে; প্রকৃত বড়ত্ব প্রদর্শনে নয়, বিনয়ে; প্রকৃত আনন্দ একা ভোগে নয়, বরং অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ায়।

কোরবানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের ভেতরের পশুত্বকে জয় করাই সবচেয়ে বড় ত্যাগ। যদি কোরবানির পরেও মানুষের আচরণে অহংকার, হিংসা, লোভ ও বৈষম্য থেকে যায়, তবে সেই কোরবানির আত্মিক সৌন্দর্য অপূর্ণ থেকে যায়। তাই কোরবানির শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে হবে।

আমাদের সমাজে যদি কোরবানির ঈদ সত্যিকার অর্থে মানবিকতার উৎসবে পরিণত হয়, তাহলে ধনী-গরিবের দূরত্ব কমবে, পারস্পরিক ভালোবাসা বাড়বে এবং সামাজিক সম্প্রীতি শক্তিশালী হবে। কারণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ নিজের আনন্দের পাশাপাশি অন্যের আনন্দের কথাও ভাবে।

আসুন, আমরা কোরবানির ঈদকে মাংসের উৎসব নয়, মনুষ্যত্বের উৎসবে পরিণত করি। আমাদের সন্তানদের শেখাই ত্যাগ, সহমর্মিতা, বিনয় ও ভালোবাসার শিক্ষা। কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য হোক মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তের মুখে আহার তুলে দেওয়া এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা।

তবেই কোরবানির ঈদ সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠবে মানবিকতার দীপ্ত এক মহোৎসব— যেখানে পশু কোরবানির পাশাপাশি মানুষ তার অহংকার, লোভ ও নিষ্ঠুরতাকেও কোরবানি দিতে শিখবে।