Dhaka ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ফেইসবুকে ইসলাম ও নবীজিকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য বিচার চেয়ে উত্তেজিত জনতার বিক্ষোভ মিছিল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে বনভূমি দখল সচেতনতার অভাবে একটি শিশুও যেন ঝুঁকিতে না পড়ে: ডিসি ফরিদা গাউসিয়া হক ভাণ্ডারী খানকাহ শরীফের ব্যবস্থাপনায় ৫দিন ব্যাপী শোহাদা-ই কারবালা মাহফিলের ৩য় দিবস সম্পন্ন তারাগঞ্জে শিশু সানজিদা হত্যার রহস্য উন্মোচন, ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বিস্ফোরক মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার কালশীতে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতায় স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইলসহ ছিনতাইকারী আটক তেকানীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল মনপুরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অপতৎপরতার প্রতিবাদে উপজেলা যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে ডিএসসিসি, বিডি ক্লিন ও রেড ক্রিসেন্টের যৌথ সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন

অতীতের দর্পণে গ্রামবাংলা: হারিয়ে যাওয়া সোনালি স্মৃতির ব্যবচ্ছেদ!

​মোঃ কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও

সময়ের স্রোতে ভেসে বদলে গেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। প্রযুক্তি ও নগরায়নের প্রবল ঢেউয়ে আজকের গ্রাম যেন আর আগের সেই সহজ-সরল, প্রাণচঞ্চল গ্রাম নেই।

মাত্র এক-দুই দশক আগেও যে গ্রামীণ জীবন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আন্তরিকতা আর পারস্পরিক নির্ভরতায় ভরপুর—আজ তা অনেকটাই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে।

একসময় ভোরের সূচনা হতো পাখির কলতান, মোরগের ডাকে আর গৃহস্থালির ব্যস্ততায়। কৃষকরা লাঙল-গরু নিয়ে মাঠে যেতেন, আর বাড়ির আঙিনায় চলতো ধান ভানা, চাল কুটা কিংবা শাকসবজি প্রস্তুতের কাজ।

জীবন ছিল কষ্টসাধ্য, কিন্তু তাতে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি ও তৃপ্তি—যা আজকের যান্ত্রিক জীবনে অনেকটাই অনুপস্থিত।

গ্রামের শৈশব ছিল নিখাদ আনন্দে ভরা। বিকেলের মাঠ মানেই ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস—হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি কিংবা লাঠিখেলা। আবার অনেকেই স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে গিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় মেতে উঠতো।

আরও পড়ুনঃ  তারাগঞ্জে ‘চিরস্থায়ী’ শাহীনুর: বদলির আইন অচল যেখানে

হৈচৈ, দৌড়ঝাঁপ আর হাসির রোল যেন গ্রামজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে মা-বাবার বকুনি বা শিক্ষকের শাসন—সেই সময়ের শাসনও আজ মধুর স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

গ্রামীণ সংস্কৃতির আরেকটি অনন্য আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা—যা শুধু বিনোদন নয়, ছিল মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনের এক বিশাল ক্ষেত্র। গ্রামের খোলা মাঠে, বড় বটগাছের নিচে কিংবা হাটের পাশে মাঝে মাঝেই বসতো যাত্রার জমজমাট আসর।

সন্ধ্যা গড়াতেই চারপাশের গ্রাম থেকে দল বেঁধে মানুষ ছুটে আসতো সেই আসরে। কারো হাতে লণ্ঠন, কারো হাতে কেরোসিনের বাতি—আলো-আঁধারের মধ্যে তৈরি হতো এক অন্যরকম আবহ।

অনেক কিশোর-যুবক আবার পরিবারের চোখ এড়িয়ে, চুপিচুপি যাত্রা দেখতে চলে যেত—কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনো একাই।

গভীর রাত পর্যন্ত নাটকের সংলাপ, গান আর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকতো তারা। যাত্রা শেষে কুয়াশা ভেজা ভোরে বা রাতের নিস্তব্ধতায় সবাই দল বেঁধে বাড়ির পথে হাঁটতো—মাঝে মাঝে হাসাহাসি, গল্প আর সেই রাতের স্মৃতি নিয়ে।

আরও পড়ুনঃ  ভুরুঙ্গামারী হাটে যানজট নিরসনে ইউএনও অমৃত দেবনাথের বিশেষ অভিযান

কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর পরই শুরু হতো আরেক দৃশ্য—অপেক্ষা করতো মা-বাবার বকুনি, কখনো দরজা বন্ধ পেয়ে বাইরে বসে থাকা, আবার কখনো নানা অজুহাত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা।

তবুও এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অপূর্ব আনন্দ, এক নির্মল শৈশব, যা আজকের প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনে।

পূর্বপুরুষদের জীবনধারা ছিল আরও সরল, কিন্তু গভীর মূল্যবোধে ভরা। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতেন, পরিশ্রমকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং একে অপরের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

গ্রামের কোনো সমস্যা মানেই সবাই মিলে সমাধান—কোনো পরিবার কষ্টে থাকলে অন্যরা এগিয়ে আসতো নিঃস্বার্থভাবে। মুরব্বিদের কথা ছিল অমূল্য, তাদের সিদ্ধান্তই ছিল সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।

সন্ধ্যা নামলেই উঠোনভরা আড্ডা, গল্প বলা, লোককথা শোনা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে জীবনের শিক্ষা নেওয়ার এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হতো। কেরোসিনের বাতি বা হারিকেনের আলোয় চলতো পড়াশোনা—যেখানে স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু চাওয়া ছিল সীমিত।

আরও পড়ুনঃ  ইতিহাস আর আধুনিকতার হাতছানি: ঐতিহ্যের জনপদ কুমিল্লা

গ্রামের হাট-বাজার ছিল প্রাণের স্পন্দন। সপ্তাহে একদিন বসা সেই হাট ছিল শুধু কেনাবেচার স্থান নয়—ছিল সম্পর্ক গড়ে তোলার কেন্দ্র। কৃষিপণ্য, তাজা মাছ, দুধ, ঘি কিংবা হাতে তৈরি জিনিস—সবকিছুতেই ছিল দেশীয়তার গন্ধ।

তবে বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ করলেও কেড়ে নিয়েছে অনেকটা সামাজিকতা। এখনকার শিশুরা মাঠের খেলায় নয়, বরং স্ক্রিনে ব্যস্ত। উঠোনভরা আড্ডা হারিয়ে গেছে, কমে গেছে প্রতিবেশীর সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক।

পরিবর্তন অনিবার্য—এটাই সময়ের দাবি। তবে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রায় যদি আমরা পূর্বপুরুষদের সেই মূল্যবোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারি, তবেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ।

গ্রামবাংলার সেই সোনালি দিনগুলো ফিরে না এলেও, তার শিক্ষা ও সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

ফেইসবুকে ইসলাম ও নবীজিকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য বিচার চেয়ে উত্তেজিত জনতার বিক্ষোভ মিছিল

অতীতের দর্পণে গ্রামবাংলা: হারিয়ে যাওয়া সোনালি স্মৃতির ব্যবচ্ছেদ!

আপডেটের সময়: ০৩:১১:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

​মোঃ কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও

সময়ের স্রোতে ভেসে বদলে গেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। প্রযুক্তি ও নগরায়নের প্রবল ঢেউয়ে আজকের গ্রাম যেন আর আগের সেই সহজ-সরল, প্রাণচঞ্চল গ্রাম নেই।

মাত্র এক-দুই দশক আগেও যে গ্রামীণ জীবন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আন্তরিকতা আর পারস্পরিক নির্ভরতায় ভরপুর—আজ তা অনেকটাই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে।

একসময় ভোরের সূচনা হতো পাখির কলতান, মোরগের ডাকে আর গৃহস্থালির ব্যস্ততায়। কৃষকরা লাঙল-গরু নিয়ে মাঠে যেতেন, আর বাড়ির আঙিনায় চলতো ধান ভানা, চাল কুটা কিংবা শাকসবজি প্রস্তুতের কাজ।

জীবন ছিল কষ্টসাধ্য, কিন্তু তাতে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি ও তৃপ্তি—যা আজকের যান্ত্রিক জীবনে অনেকটাই অনুপস্থিত।

গ্রামের শৈশব ছিল নিখাদ আনন্দে ভরা। বিকেলের মাঠ মানেই ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস—হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি কিংবা লাঠিখেলা। আবার অনেকেই স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে গিয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় মেতে উঠতো।

আরও পড়ুনঃ  ভুরুঙ্গামারী হাটে যানজট নিরসনে ইউএনও অমৃত দেবনাথের বিশেষ অভিযান

হৈচৈ, দৌড়ঝাঁপ আর হাসির রোল যেন গ্রামজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে মা-বাবার বকুনি বা শিক্ষকের শাসন—সেই সময়ের শাসনও আজ মধুর স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

গ্রামীণ সংস্কৃতির আরেকটি অনন্য আকর্ষণ ছিল যাত্রাপালা—যা শুধু বিনোদন নয়, ছিল মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনের এক বিশাল ক্ষেত্র। গ্রামের খোলা মাঠে, বড় বটগাছের নিচে কিংবা হাটের পাশে মাঝে মাঝেই বসতো যাত্রার জমজমাট আসর।

সন্ধ্যা গড়াতেই চারপাশের গ্রাম থেকে দল বেঁধে মানুষ ছুটে আসতো সেই আসরে। কারো হাতে লণ্ঠন, কারো হাতে কেরোসিনের বাতি—আলো-আঁধারের মধ্যে তৈরি হতো এক অন্যরকম আবহ।

অনেক কিশোর-যুবক আবার পরিবারের চোখ এড়িয়ে, চুপিচুপি যাত্রা দেখতে চলে যেত—কখনো বন্ধুদের সঙ্গে, কখনো একাই।

গভীর রাত পর্যন্ত নাটকের সংলাপ, গান আর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকতো তারা। যাত্রা শেষে কুয়াশা ভেজা ভোরে বা রাতের নিস্তব্ধতায় সবাই দল বেঁধে বাড়ির পথে হাঁটতো—মাঝে মাঝে হাসাহাসি, গল্প আর সেই রাতের স্মৃতি নিয়ে।

আরও পড়ুনঃ  তারাগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, গাঁজাসহ আটক যুবকের ৩ মাসের কারাদণ্ড

কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর পরই শুরু হতো আরেক দৃশ্য—অপেক্ষা করতো মা-বাবার বকুনি, কখনো দরজা বন্ধ পেয়ে বাইরে বসে থাকা, আবার কখনো নানা অজুহাত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা।

তবুও এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অপূর্ব আনন্দ, এক নির্মল শৈশব, যা আজকের প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনে।

পূর্বপুরুষদের জীবনধারা ছিল আরও সরল, কিন্তু গভীর মূল্যবোধে ভরা। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতেন, পরিশ্রমকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং একে অপরের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

গ্রামের কোনো সমস্যা মানেই সবাই মিলে সমাধান—কোনো পরিবার কষ্টে থাকলে অন্যরা এগিয়ে আসতো নিঃস্বার্থভাবে। মুরব্বিদের কথা ছিল অমূল্য, তাদের সিদ্ধান্তই ছিল সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।

সন্ধ্যা নামলেই উঠোনভরা আড্ডা, গল্প বলা, লোককথা শোনা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে জীবনের শিক্ষা নেওয়ার এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হতো। কেরোসিনের বাতি বা হারিকেনের আলোয় চলতো পড়াশোনা—যেখানে স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু চাওয়া ছিল সীমিত।

আরও পড়ুনঃ  বিস্ফোরক মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

গ্রামের হাট-বাজার ছিল প্রাণের স্পন্দন। সপ্তাহে একদিন বসা সেই হাট ছিল শুধু কেনাবেচার স্থান নয়—ছিল সম্পর্ক গড়ে তোলার কেন্দ্র। কৃষিপণ্য, তাজা মাছ, দুধ, ঘি কিংবা হাতে তৈরি জিনিস—সবকিছুতেই ছিল দেশীয়তার গন্ধ।

তবে বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ করলেও কেড়ে নিয়েছে অনেকটা সামাজিকতা। এখনকার শিশুরা মাঠের খেলায় নয়, বরং স্ক্রিনে ব্যস্ত। উঠোনভরা আড্ডা হারিয়ে গেছে, কমে গেছে প্রতিবেশীর সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক।

পরিবর্তন অনিবার্য—এটাই সময়ের দাবি। তবে উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রায় যদি আমরা পূর্বপুরুষদের সেই মূল্যবোধ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারি, তবেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ।

গ্রামবাংলার সেই সোনালি দিনগুলো ফিরে না এলেও, তার শিক্ষা ও সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।