
মোঃ রাসেল মিয়া
মোঃ জাহিদ হাসান। রাজধানীর মহাখালীর আইপিএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাততলার এক সাধারণ ছাত্র। ক্লাস এইটে পড়াকালীন শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman-কে নিয়ে একটি গল্প পড়েই রাজনীতির প্রতি তার ভালোবাসার শুরু। সেই ছোটবেলার অনুপ্রেরণা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার রাজনৈতিক চেতনা, দেশপ্রেম আর স্বপ্নভরা এক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা।
শুধু রাজনীতি নয়, ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতিও ছিল তার গভীর আগ্রহ। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বেছে নেন কমার্স বিভাগ। স্বপ্ন ছিল—একদিন বড় উদ্যোক্তা হবেন, দেশের মানুষের জন্য কিছু করবেন, নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করবেন, অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেবেন।
কিন্তু জীবন সবসময় স্বপ্নের মতো চলে না।
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০২১ সালে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন জাহিদ হাসান। নিজের সামান্য সঞ্চয়, আত্মীয়-স্বজনের সহায়তা এবং কাছের মানুষের বিশ্বাসকে মূলধন করেই এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। কিন্তু ঠিক সেই সময় বিশ্বজুড়ে শুরু হয় করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব। ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে আসে স্থবিরতা। এর মধ্যেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলারের দাম বৃদ্ধি, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া—সবকিছু মিলে তার ব্যবসা ভয়াবহ সংকটে পড়ে।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মূলধনের তীব্র সংকটে পড়েন তিনি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চার থেকে পাঁচজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। পাশাপাশি এসএমই লোনও সংগ্রহ করেন। স্বপ্ন ছিল—চায়না থেকে একটি পণ্য আমদানি করে ব্যবসাকে নতুনভাবে দাঁড় করাবেন।
কিন্তু বাংলাদেশে পণ্য পৌঁছানোর পরই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।
জাহিদের অভিযোগ, একটি ইংরেজি শব্দের বানানকে কেন্দ্র করে কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা তাকে ভয়াবহ হয়রানির শিকার করেন। “Textured Yarn” পণ্যের বানান নিয়ে অযথা জটিলতা তৈরি করা হয়। তিন মাস ধরে তাকে নানা অপমান-অপদস্থের মধ্যে রাখা হয়। প্রায় ৪৫ লাখ টাকার পণ্য শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ টাকার জরিমানা ও জটিলতার মধ্যে আটকে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু কর্মকর্তা তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেও টার্গেট করেছিলেন। মোবাইল ফোনে Khaleda Zia-এর ছবি ও পোস্টার থাকায় তাকে বিএনপি-সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় ভয়ভীতি, মানসিক নির্যাতন ও চাপ প্রয়োগ।
জাহিদ বলেন, “আমি একজন সাধারণ উদ্যোক্তা ছিলাম। স্বপ্ন ছিল ব্যবসা করে দেশের জন্য কিছু করব। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে আমাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
বর্তমানে তিনি চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। পাওনাদারের চাপ, ব্যাংকের ঋণ, ব্যবসার মূলধন হারানো—সব মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। এমনকি নিজের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্যও হারিয়েছেন বলে জানান।
তার কণ্ঠে হতাশা থাকলেও দেশ ও দলের প্রতি ভালোবাসা এখনও অটুট। তিনি বলেন, “আমি দেশকে ভালোবাসি, আমার নেতাকে ভালোবাসি। শত কষ্টের মাঝেও বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী হিসেবেই বাঁচতে চাই। আমাদের মতো অনেক উদ্যোক্তার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। তবুও আমরা এগিয়ে যেতে চাই, দেশকে ভালোবাসতে চাই।”
জাহিদ হাসানের এই গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়—এটি স্বপ্নভঙ্গ হওয়া অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার গল্প। যারা নানা সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক চাপে হারিয়ে ফেলেছেন তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্বপ্নগুলো।
প্রতিবেদকের নাম 

























