
হাসান আলম সুমন: দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলা শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে উভয় আসামিকে অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নিহত রামিসার পরিবার, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ঘোষিত এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, শিশু রামিসার ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে তা শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান প্রয়োজন বলে আদালত মনে করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, রাজধানীর পল্লবী এলাকায় বসবাসকারী শিশু রামিসা নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধার হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যার তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর তাদের গ্রেফতার করা হয়।
তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ একাধিক সাক্ষী, আলামত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ২য় পৃষ্ঠায় দেখুন পর্যালোচনার পর আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহত রামিসার স্বজনরা অশ্রুসিক্ত চোখে আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, তাদের সন্তানকে আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না, তবে অপরাধীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ায় কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রামিসার বাবা সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। আমাদের মেয়েকে যে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার হয়েছে। আমরা আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞ। এখন চাই দ্রুত রায় কার্যকর হোক। অন্যদিকে রামিসার মা বলেন, “আমার মেয়েকে হারানোর বেদনা কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু যারা আমার মেয়ের জীবন কেড়ে নিয়েছে তাদের শাস্তি হয়েছে, এটাই আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মামলার প্রতিটি ধাপে শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। আদালত সেসব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, তাদের মক্কেলরা ন্যায়বিচার পাননি এবং তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এ দাবিকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছে। রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলেছে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ রায় সমাজে একটি শক্ত বার্তা দেবে বলে তারা মনে করেন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রায় নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। উল্লেখ্য, রামিসা হত্যা মামলা দেশের অন্যতম আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলায় পরিণত হয়েছিল। তদন্ত, বিচার ও রায়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এ রায়কে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। সব মিলিয়ে শিশু রামিসা হত্যা মামলার এ রায় দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানেরও প্রতিফলন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদকের নাম 

























