Dhaka ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ধুনট সদর ইউনিয়ন শাখার কমিটি গঠন পানছড়িতে কৃতিত্বের স্বীকৃতি, জিপিএ-৫ পাওয়া পাঁচ শিক্ষার্থীর হাতে ক্রেস্ট ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর উচিৎ নয় : নাহিদ চকরিয়ায় বাস-লেগুনা সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৪ জনের, আহত ৫ মায়ের শেষ বিদায়ে ৪ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন সাবেক এমপি পুত্র মান্দায় প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত প্রসাদপুর বাজারে মোবাইল কোর্ট, তিন মামলায় ৬ হাজার টাকা জরিমানা ধামইরহাটে নিজ মেয়েকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে কুলাঙ্গার বাবা কারাগারে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পুকুর থেকে ‘পল্টু মিয়ার'(৫৭) ভাসমান মরদেহ উদ্ধার.! মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আনসারে নিয়োগ, কালিয়াকৈরে ২৮তম সিপাহী রিক্রুটমেন্ট শুরু

বন উজাড় ও অপরিকল্পিত স্থাপনায় বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

মোঃ সৈয়দ মিয়া, চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ হাতি সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর আজ বুধবার (১২ আগস্ট) বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাস্তবতা বলছে, হাতি রক্ষার বার্তা যতটা জোরালো, তাদের আবাসস্থল রক্ষার চিত্র ততটাই নাজুক। একদিকে পাহাড় ও বন উজাড়, অন্যদিকে হাতির চলাচলের পুরোনো করিডর দখল করে বসতি, কৃষিজমি, সড়কসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ সব মিলিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্র। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতির পাল ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। এতে একদিকে কৃষকের ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত। ঘটছে প্রাণহানিও। বন বিভাগ ও হাতি-গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে একসময় হাতির চলাচলের অন্তত ১২টি করিডর ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি করিডর দখল, বন উজাড় ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খাবার ও নিরাপদ বিচরণের জায়গা হারিয়ে হাতি বাধ্য হয়ে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ছে। হাতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করে। বনের উদ্ভিদ ও ফলমূলের ওপর নির্ভরশীল এ প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র থাকা জরুরি। একই সঙ্গে হাতি বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বন কেটে বসতি ও নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে হাতির আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পুরোনো চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাঁশখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্য হাতির বিচরণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি সাধারণত তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত পথ ও আবাসস্থল ধরে চলাচল করে। সেই পথ মানুষের দখলে চলে গেলে হাতির কাছে লোকালয় আর বনাঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। ফলে হাতির পাল খাবারের সন্ধানে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা বাগানে ঢুকে পড়ে। আর তখনই তৈরি হয় সংঘাতের পরিস্থিতি। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারেও হাতির আবাসস্থল সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কক্সবাজারের বনাঞ্চল ও হাতির বিচরণক্ষেত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা

 

এর প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাতেও। কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে হাতির পাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দেঁয়াং পাহাড়েও হাতির পাল দেখা গেছে। বিগত সময়ে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় হাতির আক্রমণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বাঁশখালীর জলদি বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, লোকালয়ে হাতির উপস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। আনোয়ারায় বর্তমানে আমাদের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) রাতে পাহারা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, হাতির আবাসস্থল সংকটের অন্যতম বড় চিত্র দেখা যাচ্ছে চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। চুনতি সংরক্ষিত বনের পূর্ব জঙ্গল চাম্বল এলাকায় অন্তত শতাধিক পরিবার বসতি স্থাপন করেছে। শুধু চাম্বল নয়, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর এলাকার সংরক্ষিত বনেও জলবায়ু উদ্বাস্তুরা বসতি গড়েছেন। বনের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন গাছপালা। কোথাও বন পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু হয়েছে, কোথাও গড়ে উঠেছে বসতি। এতে হাতির খাদ্যসংকটের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের চলাচলের পথ। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাড়ছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ২৪ হাজার ৪৫৪ একর। এর মধ্যে জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ১৫ হাজার ৫৯৬ একর এলাকা বাঁশখালী উপজেলায় পড়েছে। বাঁশখালী অংশে রয়েছে একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতির চলাচলের করিডর হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এসব এলাকায় মানুষের বসতি ও কৃষিকাজ বাড়ায় হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে ১৪টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে হাতির কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন মানুষ। স্থানীয়দের মতে, আগে সংরক্ষিত বনসংলগ্ন এলাকায় হাতির বিচরণ থাকলেও মানুষের সঙ্গে সংঘাত এতটা তীব্র ছিল না। বনভূমিতে মানুষের বসতি ও কৃষিকাজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতির আনাগোনাও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  শুক্রবার সালথায় আসছেন ‌ পররাষ্ট প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

শীলকূপ আষিঘর পাড়া এলাকার কৃষক আবদুর রশীদ ও ইনফাস মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করে আসছি। আগে হাতির আক্রমণের শিকার হতে হয়নি। কয়েক বছর ধরে চাষাবাদে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যহাতি। এখন প্রায়ই রাতে দলবেঁধে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট করে দেয়। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হাতিকে তাড়ানো সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং আতঙ্কিত হাতি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। হাতির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণের ফলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মূলত মানুষই হাতির জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। হাতি তাদের নিজেদের জায়গায় ফিরে আসছে। তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে, যাতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হলে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, চলাচলের করিডর দখলমুক্ত রাখা এবং বন উজাড় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি বেশি। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বনের জমিতে বসতি স্থাপন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হাতির বাসস্থান রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতিদের জন্য খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্য হাতিকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। হাতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিরাপদ আবাসস্থলে ফিরে যাবে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতির চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন এবং বন্য হাতির হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুনঃ  হ্যালো ডিসি’র দ্রুত পদক্ষেপ: কলাতিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের ময়লার ভাগাড় পরিষ্কার

 

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ধুনট সদর ইউনিয়ন শাখার কমিটি গঠন

বন উজাড় ও অপরিকল্পিত স্থাপনায় বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

আপডেটের সময়: ০৬:১৭:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ সৈয়দ মিয়া, চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ হাতি সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর আজ বুধবার (১২ আগস্ট) বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাস্তবতা বলছে, হাতি রক্ষার বার্তা যতটা জোরালো, তাদের আবাসস্থল রক্ষার চিত্র ততটাই নাজুক। একদিকে পাহাড় ও বন উজাড়, অন্যদিকে হাতির চলাচলের পুরোনো করিডর দখল করে বসতি, কৃষিজমি, সড়কসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ সব মিলিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্র। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতির পাল ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। এতে একদিকে কৃষকের ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত। ঘটছে প্রাণহানিও। বন বিভাগ ও হাতি-গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে একসময় হাতির চলাচলের অন্তত ১২টি করিডর ছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি করিডর দখল, বন উজাড় ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খাবার ও নিরাপদ বিচরণের জায়গা হারিয়ে হাতি বাধ্য হয়ে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ছে। হাতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করে। বনের উদ্ভিদ ও ফলমূলের ওপর নির্ভরশীল এ প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র থাকা জরুরি। একই সঙ্গে হাতি বন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বন কেটে বসতি ও নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে হাতির আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পুরোনো চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাঁশখালী, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্য হাতির বিচরণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি সাধারণত তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত পথ ও আবাসস্থল ধরে চলাচল করে। সেই পথ মানুষের দখলে চলে গেলে হাতির কাছে লোকালয় আর বনাঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। ফলে হাতির পাল খাবারের সন্ধানে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা বাগানে ঢুকে পড়ে। আর তখনই তৈরি হয় সংঘাতের পরিস্থিতি। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারেও হাতির আবাসস্থল সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কক্সবাজারের বনাঞ্চল ও হাতির বিচরণক্ষেত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  ধামইরহাটে বেলঘরিয়া মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে এসএসসিতে ১৬ জন ফেল, একজন পরীক্ষা দেয়নি

 

এর প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাতেও। কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা পেরিয়ে হাতির পাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দেঁয়াং পাহাড়েও হাতির পাল দেখা গেছে। বিগত সময়ে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় হাতির আক্রমণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বাঁশখালীর জলদি বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, লোকালয়ে হাতির উপস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। আনোয়ারায় বর্তমানে আমাদের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) রাতে পাহারা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, হাতির আবাসস্থল সংকটের অন্যতম বড় চিত্র দেখা যাচ্ছে চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। চুনতি সংরক্ষিত বনের পূর্ব জঙ্গল চাম্বল এলাকায় অন্তত শতাধিক পরিবার বসতি স্থাপন করেছে। শুধু চাম্বল নয়, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর এলাকার সংরক্ষিত বনেও জলবায়ু উদ্বাস্তুরা বসতি গড়েছেন। বনের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন গাছপালা। কোথাও বন পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু হয়েছে, কোথাও গড়ে উঠেছে বসতি। এতে হাতির খাদ্যসংকটের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের চলাচলের পথ। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাড়ছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ২৪ হাজার ৪৫৪ একর। এর মধ্যে জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ১৫ হাজার ৫৯৬ একর এলাকা বাঁশখালী উপজেলায় পড়েছে। বাঁশখালী অংশে রয়েছে একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতির চলাচলের করিডর হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এসব এলাকায় মানুষের বসতি ও কৃষিকাজ বাড়ায় হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে ১৪টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে হাতির কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন মানুষ। স্থানীয়দের মতে, আগে সংরক্ষিত বনসংলগ্ন এলাকায় হাতির বিচরণ থাকলেও মানুষের সঙ্গে সংঘাত এতটা তীব্র ছিল না। বনভূমিতে মানুষের বসতি ও কৃষিকাজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতির আনাগোনাও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  শুক্রবার সালথায় আসছেন ‌ পররাষ্ট প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

শীলকূপ আষিঘর পাড়া এলাকার কৃষক আবদুর রশীদ ও ইনফাস মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করে আসছি। আগে হাতির আক্রমণের শিকার হতে হয়নি। কয়েক বছর ধরে চাষাবাদে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যহাতি। এখন প্রায়ই রাতে দলবেঁধে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট করে দেয়। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হাতিকে তাড়ানো সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং আতঙ্কিত হাতি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। হাতির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও শিল্পকারখানা নির্মাণের ফলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। মূলত মানুষই হাতির জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে। হাতি তাদের নিজেদের জায়গায় ফিরে আসছে। তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে হবে, যাতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হলে হাতির আবাসস্থল সংরক্ষণ, চলাচলের করিডর দখলমুক্ত রাখা এবং বন উজাড় বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি বেশি। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বনের জমিতে বসতি স্থাপন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হাতির বাসস্থান রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতিদের জন্য খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্য হাতিকে জোর করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। হাতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিরাপদ আবাসস্থলে ফিরে যাবে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতির চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন এবং বন্য হাতির হাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুনঃ  আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা