
মোঃরাসেল বিষেশ প্রতিনিধি: টানা কয়েক দিনের অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় নজিরবিহীন দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। লামা পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ি জনপদ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। এর মধ্যে আজিজনগর ইউনিয়নে পাহাড়ধসে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।তছনছ জনপদ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ: স্থানীয় সূত্র ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলে তিন হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। উপজেলার শতাধিক গ্রামীণ সড়কসহ ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৫০টিরও বেশি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বহু এলাকার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ত্রাণ পৌঁছানো ও চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগের আঙুল পরিবেশ ধ্বংসের দিকে
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, এই ভয়াবহতার নেপথ্যে প্রাকৃতিক কারণের চেয়েও বেশি দায়ী মানবসৃষ্ট পরিবেশ ধ্বংস। তাদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে:অবৈধ ইটভাটা: লাইসেন্সহীন প্রায় ৩৬টি ইটভাটা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের পাদদেশে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।পাহাড় কাটা: শতাধিক স্থানে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা ও মাটি সরানোর ফলে পাহাড়গুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।অবৈধ বালু উত্তোলন: নদী, খাল ও ঝিরি থেকে যন্ত্রের সাহায্যে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে তীরবর্তী এলাকা ও সড়কগুলো ধসে পড়ছে।তামাক চাষ ও বন উজাড়: হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষের ফলে বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে, যা মাটির ক্ষয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশাসনের ভাষ্য
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “দুর্যোগের শুরু থেকেই প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিস সম্মিলিতভাবে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রেখেছি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসবাসকারী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছি।” অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় কাটার মতো বিষয়গুলোতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
ভবিষ্যৎ বিপর্যয় এড়াতে স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবিদরা কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
১. যৌথ অভিযান: অবৈধ ইটভাটা ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর অভিযান পরিচালনা।
২. স্বাধীন তদন্ত: পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন।
৩. দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন: ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি সরিয়ে বৈজ্ঞানিক ভূমি ব্যবস্থাপনার আওতায় পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।৪. অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ: ভেঙে পড়া সড়ক, সেতু ও কালভার্ট দ্রুত সংস্কার করে জনজীবন স্বাভাবিক করা।
স্থানীয়দের দাবি, ত্রাণ বিতরণ কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু পাহাড় ও প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য এখনই কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে লামা।
প্রতিবেদকের নাম 



















