
স্টাফ রিপোর্টারঃ শফিকুল ইসলাম (জামালপুর)
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে, ২০১৬ সালের মে মাসে আপন চাচা-ভাতিজা জোড়া খুন সংঘটিত হয়েছিল। দীর্ঘ দশ বছর তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে, আজ (২০ ই আগস্ট ২০২৬) বৃহস্পতিবার, জামালপুর বিজ্ঞ আদালত উক্ত জোড়া খুনের রায় ঘোষণা করেন।
আজকের সেই ঐতিহাসিক রায়ে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড ও সাতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। আজকের ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন জামালপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন।
মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আলতাফুর রহমান আতা ও দলটির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ইছাহাকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইছাহাকের সমর্থক ও আদারভিটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করতে ১০ এপ্রিল গজারিয়া গ্রামে যায় পুলিশ।
মোস্তফার বাড়ি চিনতে না পেরে পুলিশ রাস্তার পাশে থাকা প্রতিবেশী মহর আলী ও তার ভাতিজা স্বপন মিয়ার কাছে বাড়িটির অবস্থান জানতে চায়। তাদের দেখানো তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করে। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে মহর ও স্বপনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মোস্তফা, এমনটাই উল্লেখপূর্বক মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৬ মে রাতে গান-বাজনার কথা বলে সাখাওয়াত ও সোহেল, মহর আলী ও স্বপনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে সাদ্দামের কথিত প্রেমিকাকে তুলে আনার কথা বলে তাদের জোড়খালী ইউনিয়নের কুকুরমারী (বানিয়াপাড়া চর) এলাকার ভানু ফকিরের পাটখেতে নেওয়া হয়।
সেখানে মহর আলী ও স্বপন মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পরে জবাই করে হত্যা করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর পাটখেত থেকে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মহর আলী (১৭) গজারিয়া এলাকার আব্দুস সালাম দফাদারের ছেলে ও মির্জা আজম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। স্বপন মিয়া (১৬) একই এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে এবং সানাইবান্দা ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্পর্কে তারা আপন চাচা-ভাতিজা ছিলেন।
এ ঘটনায় স্বপনের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ২২ জনকে আসামি করে মাদারগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অপর আটজনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
অভিযোগপত্রভুক্ত ১৪ জন আসামিরা হলেন ১/ সাখাওয়াত, ২/সোহেল, ৩/চাঁন মিয়া, ৪/মো. জিয়ার, ৫/আল আমিন, ৬/সাদ্দাম, ৭/শাহ আলম, ৮/উজ্জ্বল, ৯/অন্তর, ১০/কাওসার, ১১/ফয়জুর, ১২/রিফাত, ১৩/সুমন, ১৪/মোস্তফা।
নিহত মহরের ভাই জোবাইদ আলম বলেন, ‘আমার ছোট ভাই মহর ও ভাতিজা স্বপনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাই। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস পাবে না।
মামলার বাদী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মহর ও স্বপন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছিল। আমরা শুধু আমার ছেলে ও ভাই হত্যার ন্যায়বিচার চাই রাষ্ট্রের কাছে।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম বলেন, মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আজ সুস্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এমন বিচার পাওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।
তিনি আরো বলেন_ আজকের রায়ে যে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন ১/ সাখাওয়াত ২/ সোহেল ৩/ আলামিন ৪/ সাদ্দাম ৫/ উজ্জল ৬/ অন্তর ৭/ ফয়জুর।
অপরদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যাদের হয়েছে, তারা হলেন ১/ চাঁন মিয়া ২/ মো. জিয়ার ৩/ শাহালম ৪/ কাউসার ৫/ রিফাত ৬/ সুমন ৭/ মোস্তফা।
জামালপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন বলেন_ রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের নিরপেক্ষভাবে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আজকের সেই ঐতিহাসিক রায়ে খুন হওয়া মহর আলী ও স্বপন মিয়ার পরিবার ও বাদী জাহাঙ্গীর আলম জানায়_ আমরা দীর্ঘ দশ বছর যাবত, আজকের দিনের এমন বিচারের জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। আমরাও আজকের এই নিরপেক্ষ রায়ে সন্তুষ্টজ্ঞাপন করছি এবং বিচার ব্যবস্থাপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি।
প্রতিবেদকের নাম 


















