
মাসুদ রানা মাসুম পার্বত্য ব্যুরো:
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেঘের ভেলা, পাথুরে বুক চিরে নেমে আসা দুধসাদা ঝরনা আর দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ—এসব নিয়েই পার্বত্য জেলা বান্দরবান। দেশের পর্যটন মানচিত্রে বান্দরবান এখন কেবল একটি জেলা নয়, বরং অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। যেখানে পাহাড় আর মেঘের মিতালি দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক।বান্দরবান শহর থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত নীলাচল এবং পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত নীলগিরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত নীলগিরিতে দাঁড়ালে মনে হয় আকাশটা বুঝি হাতের নাগালে। বর্ষায় মেঘের আনাগোনা আর শীতে কুয়াশার চাদরে ঢাকা এই স্পটগুলো পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। নীলাচল থেকে সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্য পর্যটকদের হৃদয়ে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করে।
আধ্যাত্মিকতা ও স্থাপত্যের মিলনস্থল: স্বর্ণমন্দির:বান্দরবানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘বুদ্ধ ধাতু জাদি’, যা সাধারণ মানুষের কাছে স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। পাহাড়ের ওপর সোনালি রঙের এই সুউচ্চ মন্দিরটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান হওয়ার পাশাপাশি এর কারুকার্যময় স্থাপত্যশৈলী যেকোনো দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। এর পাশেই রয়েছে শৈলপ্রপাত, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে নেমে আসা শীতল জলের ধারা পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে। বান্দরবানের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর দুর্গম উপজেলাগুলোতে। রুমা ও থানচি এখন অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের প্রধান কেন্দ্র। কেওক্রাডং ও বগালেক: দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়া কেওক্রাডং জয় করার রোমাঞ্চ নিতে প্রতিবছর হাজারো তরুণ ছুটে আসেন এখানে। আর পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট রহস্যময় বগালেক পর্যটকদের কাছে এক বড় বিস্ময়।
নাফাকুম ও অমিয়াখুম: সাঙ্গু নদী দিয়ে তিন্দু ও রেমাক্রি হয়ে নাফাকুম জলপ্রপাত দেখার অভিজ্ঞতা অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। পাথুরে নদীর দুই ধারে বিশালাকার পাহাড় আর তিন্দুর ‘বড় পাথর’ এলাকাটি পর্যটকদের বিমোহিত করে।
ডিম পাহাড়: আলীকদম-থানচি সড়কটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উঁচু সড়ক। এই সড়কের সর্বোচ্চ স্থান ‘ডিম পাহাড়’ থেকে নিচে তাকালে মেঘের সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
রুমা উপজেলার সাঙ্গু নদীর তীর ঘেঁষে সগৌরবে আছড়ে পড়ছে রিজুক ঝরনা। মারমা ভাষায় একে ‘রিজুক’ বলা হয়। সাঙ্গু নদী দিয়ে নৌকাযোগে এই ঝরনার পাদদেশে যাওয়ার সময় পাহাড়ের দুই ধারের সৌন্দর্য পর্যটকদের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। এখানকার ছোট মোদক ও বড় মোদক এলাকাগুলো পর্যটকদের জন্য এখনও এক অমীমাংসিত রহস্যের মতো সুন্দর।
বান্দরবানের বিশেষত্ব কেবল এর পাহাড় নয়, বরং এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। মারমা, ম্রো, বম, খিয়াং ও ত্রিপুরারাসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সহজ-সরল জীবনযাপন পর্যটকদের টানে। বর্তমানে স্থানীয়দের স্বাবলম্বী করতে এবং পর্যটনের প্রসারে এলাকায় নানা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে রুমার মতো এলাকায় স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যা পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে। বান্দরবান শহর ও এর আশেপাশের মেঘলা বা নীলাচল যাওয়া সহজ হলেও দুর্গম স্পটগুলোতে যেতে প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা ও গাইডের সহায়তা। তিন্দু, রেমাক্রি বা কেওক্রাডং ভ্রমণের জন্য যথাযথ অনুমতির প্রয়োজন হয়। প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে আর যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছতে বান্দরবানের বিকল্প নেই। দিগন্ত জোড়া পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি দেখতে চাইলে পর্যটন মৌসুমে আপনিও ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন মেঘের দেশের উদ্দেশ্যে।
প্রতিবেদকের নাম 


















