Dhaka ১০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
মৌলভীবাজারে রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হামলা নারীসহ আহত ৩ ​সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসল প্রশাসন, নন্দীগ্রামে খাস জমি ও রাস্তা উদ্ধার ​ছোলমাইড উচ্চ বিদ্যালয়ে ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট ডিভিশনের বিশেষ সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম:’নীরবতা ভেঙে পুলিশের সহায়তা নিন সাহায্য চেয়ে কেমিক্যাল প্রয়োগ; শয়তানের নিঃশ্বাস চক্রের তিন সদস্য গ্রেফতার কিশোরগঞ্জে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে হামলার শিকার চ্যানেল ওয়ানের রিপোর্টার, মামলা দায়ের সার্বভৌমত্ব ও দেশমাতৃকার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শপথ নিলেন নবীন নৌ কর্মকর্তারা রিফাত হত্যার রায়: ৫ জনের ফাঁসি, ৫ জনের ১০ বছর কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড তরুণদের হাত ধরেই আসবে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ হারাগাছ ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সভা সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

নোয়াখালীর শেকড়, লন্ডনে ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’ একই পরিবারের ৪৩ সদস্য যুক্তরাজ্যে স্থায়ী

আবদুল আজিজ সায়েম, কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী):
নোয়াখালীর শেকড় ধরে রেখে যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে যেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’। একই পরিবারের ৪৩ সদস্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার কারণে প্রবাসে স্থায়ী হলেও তারা ধরে রেখেছেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য। ফলে প্রবাসের মাটিতেও অটুট রয়েছে তাদের শেকড়ের বন্ধন।

ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শেকড় থেকে উঠে আসা গোলাম রহমান (রহমান সাহেব) পরিবারের এই ব্যতিক্রমী গল্প এখন প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও প্রশংসিত। পরিবার সূত্রে জানা যায়, দাগনভূঞা উপজেলার এনায়েত ভূঞার বংশধর গোলাম রহমান জীবিকার সন্ধানে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সে সময় ব্রিটেনে বাঙালি কমিউনিটি ছিল খুবই ছোট। কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং পরিবারের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন।

১৯৫৯ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে পরিবারের অন্য সদস্যরাও যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পান। দেশে ফিরে ১৯৬৯ সালে তিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি স্থাপন করেন।

আরও পড়ুনঃ  ভরা মৌসুমে আমে জমজমাট পত্নীতলা বিভিন্ন হাট, দাম নিয়ে চাষীদের আক্ষেপ

তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক রহমান সাহেব ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। এলাকার শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪৯ ডিসমিল, কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ৫ ডিসমিল এবং রহমানিয়া জামে মসজিদের জন্য ৭৫ ডিসমিল জমি দান করেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৪ সালে রহমান সাহেবের মেজো ছেলে গোলাম মাহমুদ ও ছোট ছেলে আব্দুল কুদ্দুছ সুমন যুক্তরাজ্যে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ২০০৬ সালে চার মেয়ে আশ্রাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনা যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সেখানে স্থায়ী হতে থাকেন।

আরও পড়ুনঃ  শাপলা রঙে সেজেছে পত্নীতলার ১৪ বিজিবি ক্যাম্পের লেক

বর্তমানে রুবি ও মিনার পরিবারের ১৮ জন, রিনার পরিবারের ৭ জন, রুনার পরিবারের ৭ জন, মাহমুদের পরিবারের ৬ জন এবং সুমনের পরিবারের ৪ জন সদস্যসহ মোট ৪৩ জন যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন পরিবারের প্রবীণ সদস্য মমতাজ বেগম।

পরিবারটির প্রায় ৩৮ জন সদস্য বর্তমানে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। নতুন প্রজন্মের অনেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কয়েকজনের বিয়ে হয়েছে যুক্তরাজ্যেই এবং সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি পারিবারিক আয়োজন।

প্রবাসে বসবাস করলেও পরিবারটির সদস্যরা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করছেন। ঈদ, বিয়ে কিংবা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই একত্রিত হন। তখন পুরো পরিবেশজুড়ে তৈরি হয় বাংলাদেশি আবহ। রান্না হয় পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি, ভর্তাসহ দেশীয় নানা খাবার। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাতেও পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

লন্ডনপ্রবাসী আশ্রাফের নেছা রুবি বলেন, “আমাদের বাবা সবসময় চাইতেন পরিবার একসঙ্গে থাকুক। বিদেশে থেকেও আমরা সেই পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখার চেষ্টা করছি। বাবার কষ্ট ও পরিশ্রমের ফলেই আজ পরিবারের সবাই ভালো অবস্থানে রয়েছে।”

আরও পড়ুনঃ  তরুণদের হাত ধরেই আসবে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ

নূরজাহান রুনা বলেন, “আমরা নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি শেখানোর চেষ্টা করি। বিদেশে থেকেও যেন তারা নিজেদের শেকড় না ভুলে যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”

লন্ডনে বার ট্রেনিং কোর্সের শিক্ষানবিশ আইনজীবী কাজী ইমদাদুল হক তানিম বলেন, “পরিবারটির সদস্যরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তারা দেশের প্রতি ভালোবাসা ও পারিবারিক ঐক্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।”

প্রবাসে থেকেও শেকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা, পারিবারিক ঐক্য অটুট রাখা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রহমান সাহেবের পরিবার আজ অনেকের কাছেই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। লন্ডনের বুকে তারা সত্যিই গড়ে তুলেছেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

মৌলভীবাজারে রাস্তা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হামলা নারীসহ আহত ৩

নোয়াখালীর শেকড়, লন্ডনে ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’ একই পরিবারের ৪৩ সদস্য যুক্তরাজ্যে স্থায়ী

আপডেটের সময়: ০৩:৩৭:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

আবদুল আজিজ সায়েম, কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী):
নোয়াখালীর শেকড় ধরে রেখে যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে যেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’। একই পরিবারের ৪৩ সদস্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। চাকরি, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষার কারণে প্রবাসে স্থায়ী হলেও তারা ধরে রেখেছেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য। ফলে প্রবাসের মাটিতেও অটুট রয়েছে তাদের শেকড়ের বন্ধন।

ফেনীর দাগনভূঞা ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শেকড় থেকে উঠে আসা গোলাম রহমান (রহমান সাহেব) পরিবারের এই ব্যতিক্রমী গল্প এখন প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও প্রশংসিত। পরিবার সূত্রে জানা যায়, দাগনভূঞা উপজেলার এনায়েত ভূঞার বংশধর গোলাম রহমান জীবিকার সন্ধানে ১৯৫৫ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সে সময় ব্রিটেনে বাঙালি কমিউনিটি ছিল খুবই ছোট। কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং পরিবারের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন।

১৯৫৯ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে তার দেখানো পথ অনুসরণ করে পরিবারের অন্য সদস্যরাও যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পান। দেশে ফিরে ১৯৬৯ সালে তিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি স্থাপন করেন।

আরও পড়ুনঃ  শাপলা রঙে সেজেছে পত্নীতলার ১৪ বিজিবি ক্যাম্পের লেক

তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক রহমান সাহেব ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। এলাকার শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪৯ ডিসমিল, কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ৫ ডিসমিল এবং রহমানিয়া জামে মসজিদের জন্য ৭৫ ডিসমিল জমি দান করেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ গ্রামে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৪ সালে রহমান সাহেবের মেজো ছেলে গোলাম মাহমুদ ও ছোট ছেলে আব্দুল কুদ্দুছ সুমন যুক্তরাজ্যে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ২০০৬ সালে চার মেয়ে আশ্রাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনা যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সেখানে স্থায়ী হতে থাকেন।

আরও পড়ুনঃ  ভেন্নাতলা বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫ দোকান ভস্মীভূত, একজন নিহত

বর্তমানে রুবি ও মিনার পরিবারের ১৮ জন, রিনার পরিবারের ৭ জন, রুনার পরিবারের ৭ জন, মাহমুদের পরিবারের ৬ জন এবং সুমনের পরিবারের ৪ জন সদস্যসহ মোট ৪৩ জন যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন পরিবারের প্রবীণ সদস্য মমতাজ বেগম।

পরিবারটির প্রায় ৩৮ জন সদস্য বর্তমানে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। নতুন প্রজন্মের অনেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কয়েকজনের বিয়ে হয়েছে যুক্তরাজ্যেই এবং সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি পারিবারিক আয়োজন।

প্রবাসে বসবাস করলেও পরিবারটির সদস্যরা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করছেন। ঈদ, বিয়ে কিংবা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই একত্রিত হন। তখন পুরো পরিবেশজুড়ে তৈরি হয় বাংলাদেশি আবহ। রান্না হয় পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি, ভর্তাসহ দেশীয় নানা খাবার। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাতেও পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

লন্ডনপ্রবাসী আশ্রাফের নেছা রুবি বলেন, “আমাদের বাবা সবসময় চাইতেন পরিবার একসঙ্গে থাকুক। বিদেশে থেকেও আমরা সেই পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখার চেষ্টা করছি। বাবার কষ্ট ও পরিশ্রমের ফলেই আজ পরিবারের সবাই ভালো অবস্থানে রয়েছে।”

আরও পড়ুনঃ  নাগেশ্বরীতে ভয়াবহ লোডশেডিং: গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন, দ্রুত সমাধানের দাবি

নূরজাহান রুনা বলেন, “আমরা নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি শেখানোর চেষ্টা করি। বিদেশে থেকেও যেন তারা নিজেদের শেকড় না ভুলে যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”

লন্ডনে বার ট্রেনিং কোর্সের শিক্ষানবিশ আইনজীবী কাজী ইমদাদুল হক তানিম বলেন, “পরিবারটির সদস্যরা নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও তারা দেশের প্রতি ভালোবাসা ও পারিবারিক ঐক্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।”

প্রবাসে থেকেও শেকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা, পারিবারিক ঐক্য অটুট রাখা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রহমান সাহেবের পরিবার আজ অনেকের কাছেই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। লন্ডনের বুকে তারা সত্যিই গড়ে তুলেছেন ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’।