
মোঃ মনিরুজ্জামান ব্যুরো চিফ, রংপুর বিভাগ
উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতো ‘রংপুর কৃষিপণ্য ও ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প পার্ক’। কিন্তু বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পটি এখন কেবলই কাগজের দলিলে সীমাবদ্ধ। দুই বছর আগে পাঠানো পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কার্যালয়ে ধুলো জমলেও, তা এখনো পৌঁছায়নি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। ফলে থমকে আছে বিনিয়োগ, অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
উদ্যোগ যখন ফাইলের ভেতর বন্দি
২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোবাশ্বের হাসান বিসিক চেয়ারম্যানের কাছে এই প্রকল্পের একটি বিস্তারিত প্রস্তাবনা পাঠান। সেখানে সদর উপজেলার হরিদেবপুর ও রামনাথপুর মৌজায় ১০০ একর জমিতে এই শিল্প পার্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়। জমির অধিগ্রহণ মূল্য ও আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ২৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দুই বছর পার হয়ে গেলেও বিসিক থেকে ফাইলটি পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।
বঞ্চিত হচ্ছে রংপুর
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই দীর্ঘসূত্রতা উত্তরাঞ্চলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘২০২৪ সালে প্রস্তাব গেল, এখন ২০২৬ সাল চলছে। অথচ কোনো অগ্রগতি নেই। এটি আমাদের অঞ্চলের উন্নয়নবঞ্চনার একটি বড় উদাহরণ। এভাবে চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলবেন।’
নারী উদ্যোক্তা রহিমা বেগমের কণ্ঠেও ঝরল হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমরা পণ্য উৎপাদন করি ঠিকই, কিন্তু সঠিক বাজার বা বিক্রয়কেন্দ্রের অভাবে পিছিয়ে পড়ছি। এই প্রকল্পে একটি সুনির্দিষ্ট সেলস সেন্টারের পরিকল্পনা ছিল, যা আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন সব অনিশ্চিত।’
অপেক্ষার প্রহর ও সম্ভাবনা
প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ১০০ একর জমির মধ্যে ২০ একর রয়েছে সরকারি খাস জমি, আর বাকি ৮০ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন। প্রতি শতক জমির দাম মাত্র ৫ হাজার টাকা হওয়ায় সরকারের জন্য এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি প্রকল্প হতে পারতো। বিসিকের রংপুর জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক এহেছানুল হক জানান, ‘জায়গাটি আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখেছি, শিল্প নগরী করার জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী। এটি বাস্তবায়িত হলে পুরো উত্তরবঙ্গের শিল্পায়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’
কেন এই বিলম্ব?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিসিকের অনুমোদনের পর তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র হয়ে একনেক সভায় পাস হতে হয়। কিন্তু রংপুরের এই প্রকল্পটি প্রথম ধাপেই আটকে থাকায় প্রশ্ন উঠছে বিসিকের সদিচ্ছা নিয়ে।
রংপুরের শিল্পায়নের চাকা সচল করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই কৃষি শিল্প পার্কের কোনো বিকল্প নেই। এখন দেখার বিষয়, বিসিকের ফাইল থেকে মুক্তি পেয়ে কবে আলোর মুখ দেখে এই স্বপ্নের প্রকল্প। দ্রুত একনেকে অনুমোদনের মাধ্যমে রংপুরের পিছিয়ে পড়া অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
প্রতিবেদকের নাম 



















