Dhaka ০৬:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যু কুলাউড়ায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিসিএসের স্বপ্নে প্রিয়ন্তী সিনহা ভাঙ্গুড়ায় মাদক সেবনের দায়ে যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড নাগরপুরে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন এমপি লাভলু ৪ বছরে ২ কোটি ৭০ লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড: শিবগঞ্জে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কক্সবাজারের চকরিয়ায় র‌্যাব-১৫ এর অভিযান সাজাপ্রাপ্ত পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার মনপুরায় আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে হামের প্রকোপ, সেবা দিতে হিমশিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টানা ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিতে আটোয়ারীতে স্থবির জনজীবন: চরম দুর্ভোগে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সীতাকুন্ডের চার ইউনিয়নে বিএনপির ত্রাণ বিতরণ

লামায় পাহাড়ধস ও বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত: প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি পরিবেশ ধ্বংসের মাশুল?

মোঃরাসেল, বিশেষ প্রতিনিধি

​টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় নজিরবিহীন দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পুরো উপজেলা। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে একদিকে যেমন বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, অন্যদিকে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে জনপদে।
​পাঁচজনের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি
লামার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় দুটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
​প্রাথমিক তথ্যমতে, লামা পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিন হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ৫০টির বেশি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বন্যার পানি জমে থাকায় উপজেলাজুড়ে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
​পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড: স্থানীয়দের অভিযোগ
দুর্যোগের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করতে নারাজ স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডই এই দুর্যোগের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে:
​অবৈধ ইটভাটা: উপজেলায় প্রায় ৩৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর কোনোটিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
​পাহাড় নিধন: বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
​অবৈধ বালু উত্তোলন: নদী ও ঝিরি থেকে যন্ত্রের সাহায্যে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
​বন উজাড় ও তামাক চাষ: বনভূমি উজাড় করে হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক মতামত
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি দুর্যোগের কারণ হলেও, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে পাহাড়গুলো আজ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টির সময় ভূমিধসের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে গেছে।
​লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস নিরলস কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
​প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সুপারিশ
ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন:
১. পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী অবৈধ ইটভাটা ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা।
২. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করা।
৩. পাহাড় পুনর্বনায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ।
৪. ভেঙে পড়া গ্রামীণ অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা।
​স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পাহাড় ও প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য এখনই কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে লামাকে।

আরও পড়ুনঃ  বজ্রপাতের অভিশপ্ত সকাল: একসাথে দুনিয়া ছাড়লেন বাবা-ছেলে
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

লামায় পাহাড়ধস ও বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত: প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি পরিবেশ ধ্বংসের মাশুল?

আপডেটের সময়: ০৩:০৪:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

মোঃরাসেল, বিশেষ প্রতিনিধি

​টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় নজিরবিহীন দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পুরো উপজেলা। সাম্প্রতিক এই দুর্যোগে একদিকে যেমন বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, অন্যদিকে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে জনপদে।
​পাঁচজনের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি
লামার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসের পৃথক ঘটনায় দুটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
​প্রাথমিক তথ্যমতে, লামা পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিন হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ৫০টির বেশি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বন্যার পানি জমে থাকায় উপজেলাজুড়ে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
​পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড: স্থানীয়দের অভিযোগ
দুর্যোগের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করতে নারাজ স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডই এই দুর্যোগের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে:
​অবৈধ ইটভাটা: উপজেলায় প্রায় ৩৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর কোনোটিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
​পাহাড় নিধন: বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
​অবৈধ বালু উত্তোলন: নদী ও ঝিরি থেকে যন্ত্রের সাহায্যে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
​বন উজাড় ও তামাক চাষ: বনভূমি উজাড় করে হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করার ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক মতামত
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি দুর্যোগের কারণ হলেও, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে পাহাড়গুলো আজ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টির সময় ভূমিধসের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়ে গেছে।
​লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস নিরলস কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
​প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও সুপারিশ
ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন:
১. পরিবেশ আইন লঙ্ঘনকারী অবৈধ ইটভাটা ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা।
২. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করা।
৩. পাহাড় পুনর্বনায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ।
৪. ভেঙে পড়া গ্রামীণ অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা।
​স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পাহাড় ও প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য এখনই কঠোর প্রশাসনিক উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে লামাকে।

আরও পড়ুনঃ  জয়পুরহাটে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল