
আবদুল আজিজ সায়েম, কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী):
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা মুছাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, তীব্র নদীভাঙন ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এ গুরুত্বপূর্ণ জল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোটি পুনরায় আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
মুছাপুর ইউনিয়নে ছোট ফেনী নদীর মোহনায় নির্মিত মুছাপুর ক্লোজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে পরিচিত। কৃষিজমির লবণাক্ততা রোধ, মিঠা পানির সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) তত্ত্বাবধানে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৬ সালে তা সম্পন্ন হয়।
প্রায় ১ দশমিক ০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ক্লোজারের সঙ্গে ২৩ ভেন্টবিশিষ্ট একটি রেগুলেটর সংযুক্ত রয়েছে, যার মাধ্যমে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার ১৪টি উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ততার হাত থেকে সুরক্ষা পায়। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য মিঠা পানি সংরক্ষণ সহজ হওয়ায় কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্লোজার নির্মাণের পর শস্য নিবিড়তা ১৫৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২০ দশমিক ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়।তবে নির্মাণের পর দীর্ঘদিন সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নদীর তীব্র স্রোত, পলি জমার পরিবর্তিত প্রবাহ এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ক্লোজারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে মাটি সরে যাওয়া, কাঠামোগত ক্ষয় এবং অতিরিক্ত পানির চাপের ফলে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট ক্লোজারের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে।
এ ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী, চরকাঁকড়া ও চরহাজারী ইউনিয়নসহ পাশের ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ, চরচান্দিয়া ও নবাবপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। তলিয়ে যায় ফসলি জমি, ভেসে যায় মাছের ঘের ও পুকুর। স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের জীবন-জীবিকায় নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।
ক্লোজার ধসের পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির পর্যালোচনা এবং পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে মুছাপুর রেগুলেটর পুনঃনির্মাণ এবং বামনী নদীতে নতুন ক্লোজার নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন প্রকল্পে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও পানির চাপ বিবেচনায় নিয়ে উন্নত পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ভাঙন ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমানো যায়।
স্থানীয়দের মতে, মুছাপুর ক্লোজার শুধু একটি বাঁধ বা জল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কৃষি ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়নের পাশাপাশি এটি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মিঠা পানির সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এছাড়া গত কয়েক বছরে মুছাপুর ক্লোজার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। স্থানীয়ভাবে এটি “মিনি কক্সবাজার” নামে পরিচিত। ক্লোজারের পাশের বিস্তীর্ণ সৈকত, সবুজ চরাঞ্চল ও নদী মোহনার মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হাজারো দর্শনার্থীর আগমনে পুরো এলাকা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, মুছাপুর ক্লোজারের দ্রুত পুনর্নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। শুধু কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নয়, বরং উপকূলীয় জনপদের টেকসই উন্নয়ন, জননিরাপত্তা এবং পর্যটন সম্ভাবনা রক্ষায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পুনর্নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারির দাবিও জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে মুছাপুর ক্লোজার আবারও তার পুরোনো সক্ষমতা ফিরে পাবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের বিশ্বাস, পুনর্নির্মিত ক্লোজার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















