
শাফিউল ইসলাম শিশির, স্টাফ রিপোর্টার: সারাদিন ফোন হাতে তবুও ভালো লাগে না? এই সমস্যার আধুনিক নাম ডোপামিন ওভারলোড, আর সুফি ঐতিহ্যে এর নাম নফসের অস্থিরতা। দুই পথের সমাধান একই। হাতে সব আছে, মনে শান্তি নেই – এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে মিললো আমাদের নিজস্ব সুফি ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের অবাক করা মিল। আমরা এমন এক প্রজন্ম, যাদের হাতে পুরো পৃথিবী। তবু দিনশেষে আমাদের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বাক্য – “ভালো লাগছে না।” ঘুম আসে না, কোনো কাজে মন বসে না, অল্পতেই রাগ ওঠে। এই অনুভূতিকে আমরা সাধারণত অলসতা ভাবি। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও প্রাচীন সুফি ঐতিহ্য – দুটোই বলছে, এটি একটি গভীর মানসিক প্রক্রিয়ার ফল।
*আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায়*: স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্স বিভাগের প্রকাশ্য লেকচার Huberman Lab-এ বলা হয়েছে, আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক আছে, যা আমাদের আনন্দ দেয়। যখন আমরা প্রতি ১০-১৫ সেকেন্ডে একটি নতুন রিলস দেখি, তখন মস্তিষ্কে বারবার ডোপামিন স্পাইক হয়। মস্তিষ্ক তখন উচ্চ উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিক আনন্দ আর তাকে আনন্দ দিতে পারে না। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ডোপামিন ওভারলোড। এর থেকে বের হওয়ার জন্য তারা যে পদ্ধতির কথা বলেন, তার নাম ডোপামিন ডিটক্স। এর মূলনীতি – ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত তথ্য ও শব্দ থেকে বিরতি, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস এবং নীরবতা পালন।
সুফি কিতাবে ৭০০ বছর আগে কী লেখা ছিল?
প্রায় ৭০০ বছর আগে সুফি সাধকরা এই একই অস্থিরতার কথা লিখেছেন। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘তাশউইশ’ বা নফসের অস্থিরতা। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থের ‘কিতাবুল খলওয়াত’ অধ্যায়ে এর চিকিৎসা হিসেবে চারটি নিয়মের কথা বলেছেন। হুজভিরি (রহ.) তাঁর ‘কাশফুল মাহজুব’ গ্রন্থেও একই কথা বলেছেন। চিশতিয়া তরিকায় এর ব্যবহারিক রূপ ছিল ‘চিল্লা’ – চল্লিশ দিনের অনুশীলন, যার স্তম্ভ ছিল – কম কথা বলা, পরিমিত আহার, পরিমিত ঘুম এবং নীরবে স্মরণ।
*দুই পথের মিল*: আধুনিক ডোপামিন ডিটক্সে যেটা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’, সুফি ঐতিহ্যে সেটাই ‘খলওয়াত’। বিজ্ঞানে যেটা ‘মাইন্ডফুল ব্রিদিং’, সুফি ঐতিহ্যে সেটাই ‘পাস-আনফাস’। উদ্দেশ্য একটাই – বাইরের শব্দ কমিয়ে ভেতরের শব্দ শোনা।
*শেষ কথা*: এই লেখা কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়, এটি একটি তুলনামূলক পাঠ। কোনো মানসিক সমস্যায় অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে এটি একটি প্রশ্ন তোলে – আমাদের যে সমস্যাকে আমরা নতুন মনে করছি, তার বীজ কি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যেই ছিল না?
তথ্যসূত্র:এহইয়াউ উলুমিদ্দিন, কাশফুল মাহজুব, A. – Huberman Lab Podcast, Episode on Dopamine, Stanford University School of Medicine (Public Lecture Series, available on YouTube, 2021),
লেখাঃ তালহা জোবাইর, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদে গবেষক,বদলগাছি নওগাঁ।
প্রতিবেদকের নাম 


















