
তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম):
কুমারের চাকায় ঘুরছে মাটি। দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সেই মাটি কখনো হাঁড়ি, কখনো কলস, সরা, মালসা কিংবা পূজার সামগ্রীতে রূপ নিচ্ছে। কোথাও আবার তৈরি হচ্ছে নানান নকশার মাটির শিল্পকর্ম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এভাবেই টিকে আছে বাঁশখালীর মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য।
তবে সময় বদলেছে। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই যেখানে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ও নানা তৈজসপত্রের ব্যবহার ছিল, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, প্লাস্টিক ও মেলামাইনের পণ্য। ফলে একদিকে কমেছে মাটির পাত্রের চাহিদা, অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সাধনপুর ও উত্তর সাধনপুরের রৌদ্রপাড়া, কালীপুর ইউনিয়নের কুমারপাড়া, পৌরসভার পূর্বাংশের কুমারপাড়া, পুকুরিয়া এবং চাম্বল ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় এখনো মৃৎশিল্পের কাজ করেন বহু পরিবার। শুধু দক্ষিণ সাধনপুরেই প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
এসব পরিবারের কাছে মৃৎশিল্প কেবল উপার্জনের পথ নয়। এটি তাদের পারিবারিক পরিচয় ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে সেই ঐতিহ্য ধরে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রশিক্ষণ আছে, নেই পুঁজি-যন্ত্রপাতি
সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. এজাজ জানান, দক্ষিণ সাধনপুরেই কয়েক দশক ধরে বহু পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে দুজন আধুনিক মাটির শিল্পকর্ম তৈরির প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।
তার ভাষ্য, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অর্থের অভাবে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ শুরু করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এনজিও সংস্থা ইপসার সহযোগিতায় গত বছর বরিশাল থেকে মৃৎশিল্পের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর পুরো উপজেলা থেকে ৮ থেকে ১০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণের পর প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে না পারায় তাদের বেশিরভাগই পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ করছেন।
এক যুগ ধরে মাটির সঙ্গে সঞ্জিতের জীবন
সাধনপুরের রৌদ্রপাড়ার কারিগর সঞ্জিত রুদ্র প্রায় ১২ বছর ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মা-বাবা অসুস্থ হওয়ার পর পারিবারিক পেশাটিই আঁকড়ে ধরেন তিনি। আধুনিক পদ্ধতিতে কাজের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু সরঞ্জাম ও পুঁজি না থাকায় সেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগানোর সুযোগ হচ্ছে না।
সঞ্জিত রুদ্র বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করতে না পারায় পণ্যের মান আশানুরূপ হয় না। ফলে ভালো দামও পাওয়া যায় না। বর্তমানে মূলত পূজাকেন্দ্রিক বিভিন্ন মাটির শিল্পকর্ম তৈরি করেন তারা। বাজারে এসব পণ্যের চাহিদাও সীমিত।
তার হিসাবে, মাটি কেনা, লাকড়ি ও খড় সংগ্রহ, চুল্লি তৈরি এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বছরে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। বিপরীতে সারা বছরে আয় হয় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা। অনেক সময় সেই আয় থেকে প্রকৃত মূলধনও উঠে আসে না।
সন্তানরা আর এই পেশায় আসতে চায় না
কালীপুর ইউনিয়নের রুদ্রপাড়ার কারিগর বিশ্বনাথ রুদ্রও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন। মৃৎশিল্পের কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার স্ত্রী। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ পেশায় দেখছেন না তিনি।
বিশ্বনাথ রুদ্র বলেন, বাজারে মাটির পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। খরচও কমেনি। তারপরও পুরোনো চাকায় হাতের তৈরি মৃৎশিল্পের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাতে হচ্ছে।
আধুনিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ নিলেও যন্ত্রপাতি কেনার মতো অর্থ না থাকলে তা দিয়ে কী হবে? কোনো রকমে তারা শিল্পটি ধরে রেখেছেন। তার সন্তানরা আর এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
শ্রম বেশি, উৎপাদন সীমিত
বাঁশখালীর কুমারদের মৃৎশিল্প তৈরির পদ্ধতিও এখনো অনেকটাই ঐতিহ্যনির্ভর। প্রথমে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এরপর মাটি থেকে বিভিন্ন ধরনের ময়লা ও শক্ত অংশ সরিয়ে পানি দিয়ে নরম করা হয়। প্রস্তুত মাটি পিটিয়ে বা মথে নেওয়ার পর বসানো হয় কুমারের চাকায়।
চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে হাত ও আঙুলের নিপুণতায় মাটিকে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় আকৃতি। পরে রোদে শুকিয়ে কাঠ, খড় ও লাকড়িসহ বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহার করে তৈরি চুল্লিতে পুড়িয়ে শক্ত করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লাগে। বিশেষ করে বর্ষাকালে মাটি শুকানোর সমস্যা দেখা দেয়। ভালো মাটি সংগ্রহ ও পরিবহন, জ্বালানি এবং উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও কারিগরদের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না বাঁশখালী
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃৎশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও বাঁশখালীর অধিকাংশ কুমার এখনো সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মোটরচালিত চাকা, আধুনিক কিলন, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় পোড়ানোর ব্যবস্থা, মাটি পরিশোধনের যন্ত্র কিংবা উন্নত গ্লেজ ও রঙ ব্যবহারের সুযোগ নেই বললেই চলে।
অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন শুধু হাঁড়ি-পাতিল নয়, ফুলের টব, কাপ-প্লেট, মগ, শোপিস, ওয়াল ডেকোরেশন এবং টেরাকোটার বিভিন্ন নান্দনিক পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব পণ্যের বাজারও তুলনামূলক বড়।
বাঁশখালীর কারিগরদের বড় একটি অংশ সেই বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। তারা মূলত স্থানীয় চাহিদা ও পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকা, বান্দরবান ও বাজালিয়া থেকে পাইকাররা পণ্য কিনতে এলেও বাজারের পরিধি সীমিত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না বলে জানান কারিগররা।
ঋণ ও প্রশিক্ষণের আশ্বাস
বাঁশখালী উপজেলা এনজিও বিষয়ক সমন্বয়কারী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সাধনপুরের কয়েকজন কারিগর তাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাদের সহজ কিস্তিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে কারিগরদের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে মৃৎশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করা যায়, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. শওকতুজ্জামান বলেন, মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কেউ এখনো তার অফিসে যোগাযোগ করেননি। তারা যোগাযোগ করলে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। প্রশিক্ষণের সনদ থাকলে ঋণের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন বলে জানান তিনি।
ঐতিহ্য বাঁচাতে দরকার নতুন বাজার
সংশ্লিষ্টদের মতে, মৃৎশিল্পকে শুধু পুরোনো ধাঁচের হাঁড়ি-পাতিল তৈরির মধ্যে আটকে রাখলে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কঠিন। মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের নকশা ও ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে।
কারিগরদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি মোটরচালিত চাকা, উন্নত কিলন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাইকারদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা গেলে কারিগররা ন্যায্য দাম পেতে পারেন। অনলাইনভিত্তিক বিপণনও খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা।
এ ছাড়া বাঁশখালীর বিভিন্ন কুমারপাড়াকে কেন্দ্র করে ছোট পরিসরে ‘মৃৎশিল্প পল্লি’ গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে। সেখানে প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আধুনিক চুল্লি, কাঁচামাল সংরক্ষণ, প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকলে একই সঙ্গে ঐতিহ্য রক্ষা এবং কর্মসংস্থান- দুই ক্ষেত্রেই সুফল মিলতে পারে।
মাটির চাকায় ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
কথিত আছে, বাঁশখালীতে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য দুই থেকে আড়াই শত বছরের পুরোনো। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক কিছু বদলে গেলেও কুমারের চাকায় মাটি ঘুরছে এখনো। কয়েকটি পরিবারের শ্রম, দক্ষতা ও ভালোবাসায় বেঁচে আছে সেই ঐতিহ্য।
তবে শুধু ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাজার, প্রযুক্তি, পুঁজি ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ-সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
বাঁশখালীর কুমারপাড়ার মাটির চাকা তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে- এটি কি ধীরে ধীরে থেমে যাবে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আবারও ঘুরবে পূর্ণ গতিতে?
পরিকল্পিত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া গেলে ঐতিহ্যের এই মৃৎশিল্প শুধু সংরক্ষিতই হবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও আয়ের একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদকের নাম 



















