
কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটে অবস্থিত কোম্পানীগঞ্জ ইউনাইটেড হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত প্রসূতি সুলতানা মমতাজ (২৭)-এর পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সন্তান প্রসবের জন্য সুলতানা মমতাজকে কোম্পানীগঞ্জ ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিজারিয়ান অপারেশনের সময় অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগের পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বজনদের দাবি, ওই সময় তিনি স্ট্রোক করেন এবং তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। প্রায় ৩০ মিনিট পর একজন চিকিৎসক এসে রোগীকে সিপিআর (CPR) প্রদান করেন। তবে দীর্ঘ সময় মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তার মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি হয়।
পরে তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েকদিন চিকিৎসার পর আর্থিক সংকটের কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই দিন পর তার মৃত্যু হয়।
মৃতের মা ও বোন অভিযোগ করে বলেন, “হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই আমাদের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।”
পরিবার আরও জানায়, সুলতানা মমতাজের আগের দুটি সন্তান রয়েছে। সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক সন্তান জন্মের পরপরই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তাদের দাবি, হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, পোস্ট-অপারেটিভ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা থাকলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক ডা. তাপস পাল বলেন, “হাসপাতালে যদি পূর্ণাঙ্গ অপারেশন ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ডাক্তার কী করবে?” অপারেশনের পর রোগীকে কতক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০ থেকে ২৫ মিনিট পর কেবিনে দেওয়া হয়েছে।” পোস্ট-অপারেটিভ রুম না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের এখানে পোস্ট-অপারেটিভ রুম নেই, এভাবেই চলে আসছে।” রোগীর মৃত্যুর দায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রোগীর হায়াত না থাকলে ডাক্তারদের দোষ কী?” পরে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অপারেশনকারী চিকিৎসক ডা. রোশন জাহান লাকি অপারেশন সম্পন্ন করার বিষয়টি স্বীকার করেন। হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে রোগীর এমন পরিস্থিতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেক হাসপাতালেই পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা না থাকায় রোগী ও চিকিৎসক উভয়কেই নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।” দায় এড়াতে পারেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অবশ্যই না।”
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল করিম বলেন, “উপজেলার অনেক হাসপাতালই এভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। রোগীর হায়াত না থাকলে শুধু হাসপাতালের দোষ বলা যায় না।” পরে তিনিও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে মৃতের পরিবারের অভিযোগ, তারা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলে হাসপাতাল মালিকপক্ষ, তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সমঝোতার উদ্যোগ নেন। এ সময় ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয় এবং একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে দাবি করেন মৃতের মা।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 


















