
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশের দেড় বছরের মধ্যেই দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার পথে হাঁটার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে দলটি। কোনো রাজনৈতিক জোটের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের শক্তিতে লড়াই করার ঘোষণা দিয়ে তৃণমূলের ভোটের মাঠে সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় নামছে এনসিপি। নির্বাচন কমিশনও বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একদিকে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী দাঁড় করানোর লক্ষ্য, অন্যদিকে ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর ও সদস্য প্রার্থী খোঁজা, সাংগঠনিক কমিটি সক্রিয় করা, কর্মী তৈরি এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে দলটিকে। এনসিপির নেতারা মাঠে ব্যাপক জনসাড়া পাওয়ার দাবি করছেন। নতুন ভোটার ও তরুণদের মধ্যে দলটির প্রতি আগ্রহের কথাও বলছেন তারা। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। এখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিচিতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় নেতৃত্ব, দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং ভোটের দিন মাঠে থাকার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই জায়গায় এনসিপি কতটা প্রস্তুত, এখন দেশের রাজনীতির অঙ্গনে সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রতিটি ইউনিয়নে প্রার্থী, লক্ষ্য তৃণমূলের বিস্তার: স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে। চলতি বছরের মে মাসে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য প্রথম ধাপে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দলটি। একই সময়ে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে এক হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এরপর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এসে পরিকল্পনার পরিধি আরও বাড়িয়েছে দলটি। গত ৩ সেপ্টেম্বর এনসিপি জানায়, ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে দল-সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার কথাও জানানো হয়। গত ২৮ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে সারজিস আলম বলেন, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে কমিটি গঠনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সাংগঠনিক কমিটি করার লক্ষ্য রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর বরগুনায় সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বক্তব্যেও একই দিকে ইঙ্গিত দেন। দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি সারজিস আলম বলেন, এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে এনসিপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আত্মপ্রকাশের দেড় বছরের মধ্যে এককভাবে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে নির্বাচন করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমরা মনে করি, এই চ্যালেঞ্জ যদি আমরা উতরে যেতে পারি, তাহলে এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি, নেতৃত্ব এবং জনসম্পৃক্ততা তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, ফলে সমান্তরালভাবে আমরা সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ করছি। আগামী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচনে আমরা প্রতিটি ইউনিয়নে এনসিপি-সমর্থিত প্রার্থী দিতে কাজ করে যাচ্ছি। এই লক্ষ্যে সফল হলে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে। এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, এনসিপির কাছে স্থানীয় নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কর্মসূচি নয়; দলীয় সংগঠন বিস্তারেরও একটি বড় প্রকল্প।
প্রার্থী আছে, কিন্তু সংগঠন কতটা প্রস্তুত? এনসিপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনেক বেশি অঞ্চলভিত্তিক। একটি ইউনিয়নে প্রার্থী দেওয়ার অর্থ শুধু চেয়ারম্যান পদে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া নয়; ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মী, ভোটার যোগাযোগ, প্রচার, নির্বাচনী এজেন্ট এবং ভোটের দিন মাঠে সক্রিয় থাকার সক্ষমতাও নিশ্চিত করা। এনসিপি এরই মধ্যে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে একই সঙ্গে কার্যকর সংগঠন দাঁড় করানো নতুন একটি দলের জন্য বড় সাংগঠনিক কাজ। এখানে দলের নিজস্ব শক্তির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মে মাসে প্রার্থী ঘোষণার সময় এনসিপি জানিয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে এক হাজারের বেশি আবেদন এসেছে। অর্থাৎ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ রয়েছে; এখন সেই আগ্রহের কতটা সাংগঠনিক ও নির্বাচনী শক্তিতে রূপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপির মেয়র প্রার্থী ও জাতীয় যুব শক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, আমরা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। মানুষ আমাদের সাদরে গ্রহণ করছে। যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় এত রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশ গেছে, জনগণ চায় সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হোক। স্থানীয় সরকার নির্বাচন একটি দলের তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এনসিপি যেহেতু নতুন রাজনৈতিক দল এবং এবার জোটের বাইরে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়া তাদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। শুধু প্রার্থী ঘোষণা করলেই সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণ হয় না; প্রার্থীর স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন কতটা কার্যকর, নির্বাচনের মাধ্যমে সেটিই মূলত বোঝা যাবে। এ নির্বাচন এনসিপির তৃণমূল বিস্তার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে। কাউন্সিলর প্রার্থী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর প্রার্থী সংগ্রহের কার্যক্রম আমাদের চলমান রয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেও ইতোমধ্যে বড় একটি অংশের কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি দলের সাংগঠনিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ অভ্যন্তরীণভাবেই চলছে। খুব শিগগির কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে একযোগে কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে। অর্থাৎ শহর পর্যায়েও প্রার্থী সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে একই ধরনের কাঠামো কত দ্রুত তৈরি করা যায়, সেটিই এনসিপির সাংগঠনিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষা।
তরুণদের সাড়া বনাম স্থানীয় ভোটের বাস্তবতা: এনসিপির রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি তরুণ নেতৃত্ব ও জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নতুন রাজনৈতিক শক্তি। দলটির নেতারা বলছেন, নতুন ভোটার ও তরুণদের মধ্যে তাদের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। মাঠের কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতেও তারা অংশ নিচ্ছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ হারুন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের প্রস্তুতি চলছে। আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করছি। এবার আমরা নিজেদের শক্তিতে নির্বাচনে অংশ নেব, কোনো রাজনৈতিক জোটে যাব না।” মাঠপর্যায়ের সাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় যে সাড়া পেয়েছিলাম, মাঠের বর্তমান পরিস্থিতিতে তার চেয়েও বেশি মানুষের সাড়া পাচ্ছি। মানুষ গতানুগতিকভাবে বিভিন্ন দলকে ভোট দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি দেখেছে। তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন সংকট নিয়ে এনসিপি যেভাবে জনগণের কথা বলছে, সেটি মানুষ ভালোভাবে উপলব্ধি করছে। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, দেশের ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় এনসিপিকে একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছে মানুষ। স্থানীয় নির্বাচনে জনগণ আমাদের ভোট দেবে—এমন প্রত্যাশা করছি। এখন পর্যন্ত মাঠে ভালো সাড়াও পাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, “তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন সংকট নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করছি। এসব কর্মসূচিতে মানুষের সাড়া পাচ্ছি। পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণসহ সামাজিক বিভিন্ন বিষয়েও আমরা কাজ করছি। এসব কর্মকাণ্ডে যুবসমাজ ও নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তা স্থানীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটে রূপ নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জায়গায় এনসিপির নতুনত্ব যেমন সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনি অভিজ্ঞতার ঘাটতিও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। দলটির সামনে তাই মূল প্রশ্ন, তরুণদের রাজনৈতিক আগ্রহকে কতটা স্থায়ী স্থানীয় সংগঠনে পরিণত করা সম্ভব?
জোটের বাইরে গিয়ে নিজের শক্তি যাচাই: জাতীয় নির্বাচনে জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার অভিজ্ঞতার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত এনসিপির কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। দলটির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে কোনো জোটের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রার্থী দাঁড় করানো হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি কতটা, তার একটি তুলনামূলক পরিষ্কার চিত্র পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ জোটের সমর্থন ছাড়া প্রতিটি এলাকায় নিজস্ব প্রার্থী, কর্মী ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী কাঠামো তৈরি করতে হবে। এনসিপি নেতা তারিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে যারা মনোনয়ন চেয়েছেন কিন্তু মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন, তাদের অনেকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে চাই না। কেউ এনসিপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে হবে। সে ক্ষেত্রেই কেবল তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য অনিয়মের আশঙ্কার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে একটি শঙ্কাও রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে ফল কারচুপি হয়েছে—এমন ধারণা থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ফল কারচুপি হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের সংশয় আছে। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি, কোনোভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা অন্য কোনো নির্বাচনে ফল কারচুপি হতে দেব না। স্থানীয় সরকার যেহেতু জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু করার সর্বাত্মক চেষ্টা আমাদের থাকবে। তবে এসব অভিযোগ ও আশঙ্কা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত; নির্বাচনের পরিবেশ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও ভোটের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
হাতে সময় কম, আসল পরীক্ষা মাঠে: এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা সময়। নির্বাচন কমিশন বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার ভোট শুরু করার পরিকল্পনা করছে। সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে তফসিল এবং নভেম্বরের শেষ দিকে ভোট শুরুর সম্ভাবনার কথা কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার আগেই দলটিকে প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় কমিটি সক্রিয়করণ, নির্বাচনী টিম গঠন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিতে হবে। ঢাকা মহানগর উত্তর আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ হারুন বলেন, বর্তমানে নতুন ভোটারদের মধ্যে এনসিপির প্রতি বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করছি। পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকেও আমরা সমর্থন ও উৎসাহ পাচ্ছি। অনেকে আমাদের বলছেন, আপনারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিন, আমরা আপনাদের পাশে থাকব। জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে দলটির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছি। দেশে গুম, খুনসহ বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সারজিস আলমও নির্বাচনী সাফল্যকে কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, বিজয়ী হওয়াটাকেই একমাত্র লক্ষ্য না ধরে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রার্থী ঘোষণা করে লড়াই করা এবং নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে এনসিপি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ী নির্ধারণে এনসিপি হয়ে উঠবে ডিসিশন মেকার। এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে এনসিপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আত্মপ্রকাশের দেড় বছরের মধ্যে এককভাবে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে নির্বাচন করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
সারজিস আলম এনসিপির বর্তমান প্রস্তুতি তাই একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়েছে—এমন বলা যায় না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, প্রার্থী বাছাই, শতাধিক উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা, জেলা সফর এবং ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে সাংগঠনিক কমিটি গঠনের উদ্যোগ দলটির প্রস্তুতির প্রমাণ দেয়। একই সঙ্গে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণাও এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। তবে ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব সাংগঠনিক সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান এখনো পুরোপুরি পরিমাপ করা যায়নি। প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়নে কার্যকর প্রার্থী, কর্মী ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কাঠামো দাঁড় করানো যে বড় সাংগঠনিক কাজ, সেটিই এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনই দেখাবে জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উঠে আসা এনসিপি কতটা দ্রুত তৃণমূলে পৌঁছাতে পেরেছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়া যেমন দলের বিস্তৃতির প্রমাণ হতে পারে, তেমনি প্রার্থী ও সংগঠনের কার্যকারিতা ভোটের মাঠে পরীক্ষিত হবে। তাই এখন এনসিপির জন্য মূল প্রশ্ন প্রার্থী ঘোষণার সংখ্যা নয়; বরং সেই প্রার্থীদের পাশে কতটা সংগঠন, কতটা স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কতটা ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সক্ষমতা দাঁড় করানো যায়। এই অর্থে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এনসিপির জন্য একই সঙ্গে প্রার্থী বাছাই, সংগঠন বিস্তার এবং জনসম্পৃক্ততা যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় মাঠপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন একটি দলের তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এনসিপি যেহেতু নতুন রাজনৈতিক দল এবং এবার জোটের বাইরে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়া তাদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। শুধু প্রার্থী ঘোষণা করলেই সাংগঠনিক শক্তি প্রমাণ হয় না; প্রার্থীর স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন কতটা কার্যকর, নির্বাচনের মাধ্যমে সেটিই মূলত বোঝা যাবে। এ নির্বাচন এনসিপির তৃণমূল বিস্তার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে।
প্রতিবেদকের নাম 






















