
আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস ২০২৬: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির নির্মম ব্যবধান
-এইচ. এম. হাসান আল মামুন (লিমন) কাগজে-কলমে সংখ্যাটি বেশ ভারী—১ লাখ ৭৫ হাজার নিবন্ধিত সমবায় সমিতি, ১,২০০ কেন্দ্রীয় সমিতি, ১১টি জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় পৌনে ২ কোটি সদস্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস ২০২৬-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে যদি আমরা আত্মতুষ্টির খোলস ছেড়ে বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে এক কঙ্কালসার চিত্র ভেসে ওঠে। প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল সমবায় কাঠামো কি আসলেই দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যবদল করছে, নাকি তা কেবলই সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন আর সেমিনারের স্লাইড শোর শোভা বর্ধন করছে? আজ স্বীকার করার সময় এসেছে, দূরদর্শী নীতিমালার অভাব, আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতা এবং সমবায় সেক্টরের নীতি-নির্ধারকদের নেতিবাচক ও সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশের সমবায় খাত এক গভীর অচলাবস্থায় নিমজ্জিত।
সংবিধানে সমবায়: সদিচ্ছা বনাম আমলাতান্ত্রিক অনাগ্রহ
আমাদের সংবিধানে মালিকানার দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে সমবায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশনের মঞ্চ থেকে সমবায়কে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি করার যে রূপরেখা দিয়েছিলেন, তা আজ আমলাতান্ত্রিক ফাইলের নিচে চাপা পড়ে গেছে। সমবায় নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের চিন্তাভাবনা আজ কেবল ‘প্রকল্প’ এবং ‘বাজেট বরাদ্দ’ কেন্দ্রিক। সমবায়কে টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও আন্তরিক সদিচ্ছা নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে দেখা যায় না। ফলে, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও সাংগঠনিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান আজ প্রায় নগণ্য। সমবায়ের বিকল্প দারকরানোর প্রচেষ্টাও হয়েছে অনেক।
নিষ্ক্রিয়তার দায় কার?
সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাবে দেশের সিংহভাগ সমবায় সমিতি আজ সাইনবোর্ড সর্বস্ব ও নিষ্ক্রিয়। সমিতিগুলোতে নিয়মিত অডিট হয় না, গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা করা হয় না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, দেশজুড়ে উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ)-গুলোর যে বিশাল অবকাঠামো, জমি ও ভবন রয়েছে, তার একটা বড় অংশ আজ অব্যবহৃত, পরিত্যক্ত বা প্রভাবশালীদের দখলে। বিদ্যমান মন্ত্রণালয় বা সমবায় কর্তৃপক্ষ বা বিআরডিবি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই সম্পদগুলোর আধুনিকায়ন বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের কোনো যুগোপযোগী পরিকল্পনা তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা সমবায়কে আধুনিক ‘বিজনেস মডেল’ হিসেবে না দেখে, স্রেফ একটি অনুদান-নির্ভর খাত হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চায়, যা সমবায়ের মূল চেতনার পরিপন্থী।
বিপণন ব্যর্থতা ও সিন্ডিকেটের জয়জয়কার;
বর্তমান সময়ে কৃষিপণ্যের অস্থিতিশীল বাজার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট দেশের সবচেয়ে বড় সংকট। কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না, অথচ ভোক্তাকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হয়। এই বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হতে পারত সমবায়ভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain)। কিন্তু সমবায় অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সমবায় বিপণন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ উদাসীনতা দেখিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত (আমুল মডেল), জাপান বা নেদারল্যান্ডস যেখানে সমবায়কে বাজারের নিয়ন্ত্রক বানিয়েছে, সেখানে আমাদের দেশের সরকারি কর্তারা সমবায়কে কেবল ‘ঋণ বিতরণ ও আদায়ের’ ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রেখেছেন। ডিজিটাল সমবায় বা অনলাইন বাজার সংযোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কাগুজে প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার চরম খেসারত:
সমবায় খাতের স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ সমবায় অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)-এর মতো প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যকার চরম সমন্বয়হীনতা ও রেষারেষি। মাঠপর্যায়ে কে কার ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে—এই আমলাতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূল সমবায় আন্দোলন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা লক্ষনীয়। জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নীতিগত নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতিবাচক মানসিকতা ও দূরদর্শিতার অভাব নিচের স্তরের সাধারণ সমবায়ীদের মধ্যে এক ধরনের চরম অনাস্থা ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। যুবসমাজ ও নারীরা আজ সমবায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, কারণ তারা এখানে কোনো আধুনিক পেশাদারিত্বের ছোঁয়া দেখছে না।
এবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পালা:
আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস ২০২৬-এ আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হবে। সমবায় খাতকে যদি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, সনাতন ফাইল চালাচালি এবং প্রকল্প-নির্ভর কাগুজে মানসিকতা থেকে মুক্ত করা না যায়, তবে এই দিবস পালন কেবলই এক আনুষ্ঠানিকতার বৃত্তে বন্দি থাকবে। সমবায় কোনো দাতব্য চিকিৎসালয় নয়, এটি একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক শক্তি।
এখনই সময় মন্ত্রণালয়, সমবায় কর্তৃপক্ষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের নেতিবাচক ও ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার। ইউসিসিএ-গুলোকে আধুনিক কৃষি সেবা ও বিপণন হাবে রূপান্তর করা এবং সমবায় বাজার ব্যবস্থা চালু করার জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে জরুরি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে, কৃষকের অধিকার আর টেকসই পল্লী উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশন।
প্রতিবেদকের নাম 























