
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দুপুর ১২টা। রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের টিকিট কাউন্টার পেরিয়ে আউটডোরের আগে করিডরে বিছানা পেতে বসে আছে ১২ থেকে ১৫টি পরিবার। তাদের একজন আফরিন সুলতানা ( ৩২)। এসেছেন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পা ভেঙে গেছে। গত এক মাসের অধিক সময়ে অন্তত চারবার রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে এসে ফিরে গেছেন, সিট খালি নেই বলে ভর্তি দেওয়া হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার ভর্তি হতে পারবেন বলে সব প্রস্তুতি নিয়ে সকালে এসেছেন হাসপাতালে। সঙ্গে আসা মা-বাবা মাদুর পেতে ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে বসে আছেন, ট্রলিতে শুয়ে আছেন আফরিন। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায় এমন চিত্র। এসময় কথা হয় আফরিনের বাবা সাহেব উল্যাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চার তারিখ (চার দফা) ঘোরানোর পর আজ ভর্তি দিবে বলছে। সকাল সকাল গাড়ি নিয়ে এসে বসে আছি। এ পর্যন্ত চারবার আসতে গাড়ি ভাড়ায় ৫০ হাজার টাকা চলে গেছে। এরপর চিকিৎসার কী হয় আল্লাহ জানেন। পাশেই হুইল চেয়ারে বসা সুজন।
এসেছেন শরীয়তপুর থেকে। রাজমিস্ত্রী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে রডের বাড়ি খেয়ে পা ভেঙে গেছে। তিনিও এক সপ্তাহ আগে আসছিলেন। তখন এক সপ্তাহ পর আসতে বলা হয়। আজ আবার এসে সিরিয়ালে আছেন। তবে ভর্তির বিষয়ে নিশ্চিত নন। ডাক্তার কোনো বৈঠকে আছেন। বৈঠক থেকে এসে দেখে সিদ্ধান্ত দেবেন। কখনো সরকারি হাসপাতালে আসিনি। আজ অসহায় অবস্থায় আসছি। সকাল থেকে ট্রলিতেই লাইন ধরে আছি। খুবই লজ্জা লাগছে। নিজের অসহায়ত্ব আর হাসপাতালের পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ।- ভর্তির অপেক্ষায় থাকা খোরশেদ আলম আরেকটু এগিয়ে হাসপাতালের নিচতলার আউটডোরের দেখা গেলো শত শত রোগীর অপেক্ষা। এদের একজন ট্রলিতে বসে আছেন, নাম খোরশেদ আলম। বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। কর্মসূত্রে থাকেন চট্টগ্রামে। সেখানেই তার মোটরসাইকেলে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় ট্রাক। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে পা ভেঙে গেছে। বেসরকারি এক হাসপাতালে অপারেশন করলেও এখনো ঠিক হয়নি। পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতালে এসেছেন। আনুমানিক চল্লিশ বছর বয়সী খোরশেদ আলম বলেন, ‘কখনো সরকারি হাসপাতালে আসিনি। গতকাল অসহায় অবস্থায় আসছি।
সকাল থেকে ট্রলিতেই লাইন ধরে আছি। খুবই লজ্জা লাগছে। নিজের অসহায়ত্ব আর হাসপাতালের পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। শুধু আফরিন, সুজন বা খোরশেদ আলম নন; বৃষ্টিভেজা দিনেই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে এক হাজার ১৮৮ জন রোগী এসেছেন। সবারই একই অবস্থা। অধিকাংশই ভর্তি থেকে অপারেশন প্রয়োজন। দূর-দূরান্ত থেকে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। সিরিয়ালে সময় তো লাগবেই। অপারেশনের জন্য রোগীকে প্রস্তুত করতে হয়। যারা আগে ভর্তি হয়, তাদের আগে অপারেশন করতে হয়। ভর্তির জন্য সিট খালি থাকে না, তখন ভর্তি করবো কীভাবে? যখন রোগীর ভর্তি হওয়ার দরকার ২০০, সিট আছে ফাঁকা ৫০টা।- নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কেনান একই চিত্র হাসপাতালের ভেতরেও। একাধিক ভর্তি রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে ভর্তি হতে যেমন যুদ্ধ, আবার ভর্তির পর অপারেশনের সিরিয়ালেও আরেক যুদ্ধ। সিরিয়াল সহসা পাওয়া যায় না। ১৫ দিন থেকে এক মাসও অপেক্ষা করা লাগে। এক রোগীর স্বজন শাহে আলম বলেন, ‘আমরা গত সপ্তাহে ভর্তি হয়েছি। এখনো অপারেশনের সিরিয়াল পাইনি। যারা সিরিয়াল পায়, তাদেরও সময় লাগে। অনেক সময় সিরিয়াল পাওয়ার পরও ঠিক থাকে না, পিছিয়ে দেয় তারিখ।
এসব অভিযোগ স্বীকার করে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কেনান বলেন, ‘সিরিয়ালে সময় তো লাগবেই। অপারেশনের জন্য রোগীকে প্রস্তুত করতে হয়। যারা আগে ভর্তি হয়, তাদের আগে অপারেশন করতে হয়। সময় তো লাগবেই। ভর্তির জন্য সিট খালি থাকে না, তখন ভর্তি করবো কীভাবে? এটা তো সারা বাংলাদেশের সাধারণ চিত্র। যখন রোগীর ভর্তি হওয়ার দরকার ২০০, সিট আছে ফাঁকা ৫০টা। তো এরকম তো প্রতিদিনই ফেরত যায়, প্রতিদিনই আবার আসে। প্রায়োরিটি ভিত্তিতে ভর্তি করতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকল্প নিচ্ছি, আরও ৫০০ শয্যা বাড়ানোর। এটা হলে কষ্টটা আরেকটু কমবে। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরের ইন্সট্রুমেন্টাল ফ্যাসিলিটি বাড়াতে চেষ্টা করছি। এ জন্য বারবার লিখছি। সরকার বাজেট দেবে। তবে সাধারণত সরকারি কাজে একটু সময় লাগে।
প্রতিবেদকের নাম 
























