
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর হচ্ছে সরকার। ওই লক্ষ্যে সরকার নতুন করে কঠোর আইন করেছে। ওই আইনে ভূমি ব্যবহার জোনিং, বিশেষ কৃষি অঞ্চল, দুই বা ততোধিক ফসলি জমি সুরক্ষা, টপসয়েল অপসারণ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ স্থাপনা অপসারণের মতো বিধান রাখা হয়েছে। তাছাড়া নতুন আইনে তুলে ধরা হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন, উন্নয়নকাজ, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে ভূমির প্রকৃতি ও শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়ও। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৮ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর (দুই কোটি ১৮ লাখ একর) আবাদযোগ্য কৃষিজমি রয়েছে। যা দেশের মোট আয়তনের ৫৯.৭ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমি রক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের কৃষিজমির ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে। অথচ জনসংখ্যার তুলনায় সীমিত ভূমির দেশে মোট ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশই আবাদযোগ্য। কিন্তু তারপরও জনবসতি সমপ্রসারণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন, শিল্প-কারখানা, সড়ক ও বাজার নির্মাণ, ইটভাটা স্থাপনসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষিজমি। নতুন আইনে ভূমি ব্যবহার জোনিং ম্যাপ তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। যাতে কোন জমি কৃষিকাজে থাকবে, কোন এলাকা আবাসন বা শিল্পের জন্য ব্যবহার করা যাবে, ভূমির প্রকৃতি ও ব্যবহার বিবেচনায় নিয়ে তা নির্ধারণ করা যায়।
পাশাপাশি বছরে দুই বা ততোধিক ফসল উৎপাদিত হয় এমন কৃষিজমিকে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশেষ কৃষি অঞ্চল ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। ওসব এলাকায় ভূমির ক্ষতি, ভূমিরূপ পরিবর্তন এবং কৃষি ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। সূত্র জানায়, জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল কেটে নেয়া দেশের কৃষিজমি রক্ষার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য নতুন আইনে কৃষিজমির টপসয়েল কেনাবেচা, অপসারণ, পরিবহন ও অন্য কাজে ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। কারণ মাটির উপরিভাগের স্তরেই জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের বড় অংশ থাকে। আর ওই স্তর কেটে নেয়া হলে জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়। তাছাড়া প্রচলিত ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনেও কৃষিজমি, আবাসিক এলাকা, বন, বাগান ও জলাভূমিতে ইটভাটা স্থাপনের ওপর বিধি-নিষেধ রয়েছে। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমির মধ্যে কিংবা কৃষিজমির পাশে ইটভাটা তৈরি করা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, দেশে দুই বা ততোধিক ফসলি জমি রক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য নতুন আইনে দুই, তিন, চার বা ততোধিক ফসলি কৃষিজমি সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নতুন আইনে কৃষিজমি অবৈধভাবে ব্যবহার করলে শুধু জরিমানা নয়, জমির প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও নেয়া যাবে। কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি অপসারণ, কৃষিজমি ভরাট কিংবা সেখানে স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে।
অবৈধভাবে সরানো মাটি পুনঃস্থাপন, ভরাট করা মাটি বা বালু অপসারণ এবং প্রয়োজনে অবৈধ স্থাপনা সরানোর নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। তাছাড়া নতুন আইনে কৃষিজমি সুরক্ষায় বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে কারাদন্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি অপরাধে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম জব্দ করার সুযোগও রাখা হয়েছে। নতুন আইনে কৃষিজমি রক্ষার দায়িত্ব শুধু জমির মালিক বা কৃষকের নয়, বরং সরকার, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং জেলা প্রশাসনের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে এ প্রসঙ্গে শরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন জানান, কৃষিজমি একবার অন্য স্থাপনায় পরিণত হলে তা আবার ফসলি জমিতে ফিরিয়ে আনা কঠিন। আর টপসয়েল হারানো জমির উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়। কৃষিজমি সুরক্ষার বিষয়টি শুধু ভূমির শ্রেণি বা মালিকানার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তাও সরাসরি জড়িত। অন্যদিকে দেশের ফসলি জমি ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে দেশের কৃষিজমি রক্ষা করা হবে। সেক্ষেত্রে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
প্রতিবেদকের নাম 























