
ভোলা প্রতিনিধিঃ ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় এমনিতেই ঋণ-দেনার চাপে বিপর্যস্ত ভোলার জেলেরা। শেষ সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় ছিলেন তারা। কিন্তু সেই আশাতেও বাধা হয়ে এসেছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞার আগে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ শিকারের সুযোগও পাচ্ছেন না জেলেরা। ফলে একদিকে ইলিশ না পাওয়ার হতাশা, অন্যদিকে ঋণ-দেনার বোঝা আর নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালানোর দুশ্চিন্তায় দিশেহারা ভোলার প্রায় ৩ লাখ জেলে। সরেজমিনে দেখা যায় আজ মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর জুন মাস থেকে ইলিশের ভরা মৌসুম শুরু হলেও জেলেদের জালে মিলেনি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশের। ফলে ধার-দেনা ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে শেষ সময়ের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ শিকার করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা জেলেদের। কিন্তু সফল হচ্ছে না তারা। আগামী ৮ অক্টোর থেকে ২৯ অক্টোর পর্যন্ত শুরু হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। তাই আগে ভাগেই অনেক জেলেরা তাদের জাল, নৌকা, ট্রলারসহ মাছ ধরার উপরকরণ নিয়ে তীরে ফিরে এসে জাল মেরামত করছেন। তাদের চোখে মুখে এখন দুশ্চিন্তার ভাজ। তাদের দাবি, সরকারিভাবে নিবন্ধিত সব জেলের ভাগ্যে জুটে না সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত চাল।
‘২২ দিনের জন্য জেলেদের থেকে কিস্তি আদায় বন্ধ রাখারও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি এবছর শতভাগ বাস্তবায়ন হবে। এছাড়াও চলতি বছর নিষেধাজ্ঞা শতভাগ পালনের জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে আমরা অভিযান কঠোর করবো। এতে আগামীকে দেশের ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং ভরা মৌসুমে জেলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ শিকার করতে পারবে। ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শান্তিরহাট গ্রামের জেলে রফিকুল ইসলাম মাঝি জানান, ভরা মৌসুমে তারা জেলেরা বুক ভরা আশা নিয়ে দল বেঁধে নদীতে গিয়েছেন। কিন্তু আশা পূরণ হয়নি। জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত নদীতে গিয়ে আশানুরূপ ইলিশ পাননি। সামনে ৯-১০ অক্টোবর ইলিশের জো। সেই জোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরার আশঙ্কা আছে। আমরা জেলেরা ভাবছি ওই সময় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ শিকার করে সব ধার-দেনা পরিশোধ করে ঘুরে দাঁড়াত পারবো। কিন্তু তার মধ্যে আবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে ৮ অক্টোবর থেকে। ফলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ বছর আমাদের জেলেদের জন্য খুবই খারাপ সময় গেছে। ধার-দেনা আর পরিশোধ করতে পারবো না। নিষেধাজ্ঞার পরে নতুন করে জাল কিনবো বা পুরোনো জাল ও নৌকা, ট্রলার মেরামত করবো সেই টাকা কোথায় পাবো। আগের ধার-দেনা পরিশোধ করতে পারিনি, নতুন কর আবার কেউ টাকা ধারও দেবে না।
ভরা মৌসুমে তারা জেলেরা বুক ভরা আশা নিয়ে দল বেঁধে নদীতে গিয়েছেন। কিন্তু আশা পূরণ হয়নি। জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত নদীতে গিয়ে আশানুরূপ ইলিশ পাননি। সামনে ৯-১০ অক্টোবর ইলিশের জো। সেই জোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরার আশঙ্কা আছে। আমরা জেলেরা ভাবছি ওই সময় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ শিকার করে সব ধার-দেনা পরিশোধ করে ঘুরে দাঁড়াত পারবো। কিন্তু তার মধ্যে আবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে ৮ অক্টোবর থেকে। ফলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সঙ্গী জেলেরা বলেন, চলতি ভরা মৌসুমে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেদের জালে মিলেনি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশের। আগের ধার-দেনা ও ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি তারা। ফলে ধার-দেনা ও ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন জেলেরা। তার মধ্যে ৮ অক্টোবর থেকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞা এখন জেলেদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও সরকারি নিষেধাজ্ঞা মানতে জাল, নৌকা ও ট্রলার নিয়ে আগে ভাবেই তীরে ফিরছেন তারা।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাত উপজেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন রয়েছে। এরমধ্যে এবছর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে জন্য সরকারিভাবে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলের জন্য ৩ হাজার ৫৯১.৪ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে ভোলা সদরে ৫২৫ টন, দৌলতখানে ৫০০ টন, বোরহানউদ্দিনে ৪৩০ টন, তজুমদ্দিনে ৪৩২.৫ টন, লালমোহনে ৫২৫ টন, চরফ্যাশনে ৮৯১.৪ টন ও মনপুরা উপজেলায় ২৮৭.৫ টন। প্রত্যেক জেলেকে দেওয়া হবে ২৫ কেজি কর চাল। তবে নিবন্ধত থাকওে সরকারি চাল জুটবে না ২৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলে। এদিকে ভোলার সৎ উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করে প্রায় ৩ লাখ জেলে জীবিকা নির্বাহ করলেও ভোলা জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। এরমধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় ২২ হাজার ২৫২ জন, দৌলতখান উপজেলায় ২১ হাজার ৫০২ জন, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ১৯ হাজার ৩৫০ জন, তজুমদ্দিন উপজেলায় ১৮ হাজার ৭১৭ জন, মনপুরা উপজেলায় ১৬ হাজার ৪০০ জন, লালমোহন উপজেলায় ২৪ হাজার ৮০৬ জন ও চরফ্যাশন উপজেলায় ৪৪ হাজার ২৮৫ জন জেলের নিবন্ধন রয়েছে।
৮ তারিখ অভিযান আমাদের জেলেদের গলার কাঁটা। এবার সিজনে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে ধার-দেনা করে সংসার ও সমিতির কিস্তি চালিয়েছি। অভিযানের মধ্যে চাল কিনেরও টাকা নেই। সরকার আমাদের জন্য ২৫ কেজি করে চাল দেয়। সেটা যদি এবছর আমাদের ৯ থেকে ১০ তারিখের জন্য বিতরণ করে তবে মোটামোটি ভাত খেতে পারবো। আর ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু কিনবো সেই টাকাও নেই। যদি সরকার চালের সঙ্গে কিছু টাকা দিতো তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শান্তিরহাট গ্রামের জেলে মো. সিরাজ মাঝি জানান, এ সিজনটা আমাদের ভালো যায়নি। আগের কোনো ধার-দেনা এমনকি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পারিনি ঠিকমতো। কোনো টাকাও জমা করতে পারিনি যে অভিযানের মধ্যে খাবো। এখন সরকারি অভিযান দিয়েছে। কি করবো নিষেধাজ্ঞা তো মানতে হবে। নিষেধাজ্ঞা না মানলে তো আবার জেল ও জরিমানা গুনতে হবে। তখন কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে না। কেউ টাকাও দেবে না। তাই নিষেধাজ্ঞার দুই দিন আগেই জাল ও ট্রলার নিয়ে আমরা তীরে ফিরে এসেছি। অভিযান শেষ হলে আবারও নদীতে যাবো।
একই ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের জেলে ইব্রাহীম মাঝি বলেন, ৮ তারিখ অভিযান আমাদের জেলেদের গলার কাঁটা। এবার সিজনে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে ধার-দেনা করে সংসার ও সমিতির কিস্তি চালিয়েছি। অভিযানের মধ্যে চাল কিনেরও টাকা নেই। সরকার আমাদের জন্য ২৫ কেজি করে চাল দেয়। সেটা যদি এবছর আমাদের ৯ থেকে ১০ তারিখের জন্য বিতরণ করে তবে মোটামোটি ভাত খেতে পারবো। আর ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু কিনবো সেই টাকাও নেই। যদি সরকার চালের সঙ্গে কিছু টাকা দিতো তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। ভেদুরিয়া ইউনিয়নের চর ভেদুরিয়া গ্রামের জেলে আলমগীর মাঝি বলেন, প্রতি বছর সরকার আমাদের জেলেদের চাল দেয়। কিন্তু সেই চাল আমরা সঠিকভাবে পাই না। যদি ২৫ কেজি দেয় আমাদের দেয় ১৫ থেকে ১৭ কেজি, ৩০ কেজি ৪০ কেজি দিলে আমরা পাই ২৫ থেকে ৩০ কেজি। যারা বিতরণ করে তারাই আমাদের চাল ওজনে কম দেয়। এ বছর আমরা চাল কম নিতে চাই না। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি এ বছর ২২ দিনের চাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার অথবা ডিজির মাধ্যমে বিতরণ করুক। তাহলে ওজনে চাল কম পাবো না।
ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি গ্রামের জেলে হেলাল মাঝি বলেন, সরকার প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান দেয়। আমরা জেলেরা কষ্ট হলেও পালন করি। কিন্তু আমদের কথা কেউ ভাবে না। জেলে নিবন্ধন আছে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারি বরাদ্দকৃত চাল আমার ভাগ্যে জুটেনি। আমার মতো অনেক জেলেই জেলে কার্ড আছে কিন্তু চাল পায় না। ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের সময় দায়িত্বরতরা বলেন- সব জেলের নামে চাল আসেনি। তাই প্রতি বছরই চাল না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যাই। ধার-দেনা করে চাল কিনে খাই। জেলে কার্ড থাকার পরও যদি চাল না পাই তাহলে আমাদের জেলে কার্ড কি কারণে দিলো। পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের জংষন গ্রামের জেলে মহিউদ্দিন মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে তো আমাদের কোনো আয়-রোজগার হবে না। আমরা কিভাবে সমিতি চালাবো। আমরা প্রতিটি জেলেই ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল ও ট্রলার, নৌকা কিনছি। আয় না থাকলে তো কিস্তি দেওয়া সম্ভব হবে না। আমরা এবছর ২২ দিনর নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের কিস্তি বন্ধ রাখার দাবি করছি।
প্রতিবেদকের নাম 

















