Dhaka ০৩:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ৮ জন কাউনিয়ায় মাদক খেয়ে মাতলামী দুই যুবকের কারাদণ্ড নরসিংদীর রায়পুরায় দৌলতকান্দি রেলস্টেশনে মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত দৈনিক সকালের শিরোনামের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি নাজমুল ইসলামের জন্মদিন পালিত কেরানীগঞ্জে সেলুনে ঢুকে মাছ ব্যবসায়ীকে হত্যা শরীয়তপুরে আল-মাদানী নূরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসার ষষ্ঠ বার্ষিকী উপলক্ষে ইসলামিক সাংস্কৃতিক ও প্রতিযোগিতা লামায় রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্রের জায়গায় ঘর নির্মাণে বাধা নাগরপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, পুড়ল ৩ দোকান ঝিনাইদহে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সম্পত্তি দখলের হুমকির অভিযোগ নাটোরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

২৫ বছরে চট্টগ্রামে কমেছে আড়াই লাখ হেক্টর বনাঞ্চল

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৬:২১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৮ সময় দেখুন

মোঃ সৈয়দ মিয়া চট্টগ্রাম ব্যুরো: একসময় ঘন সবুজে ঢাকা ছিল সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচর। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করা ম্যানগ্রোভের এক নিবিড় প্রাচীর, যা দ্বীপবাসীকে ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে আগলে রাখত। কিন্তু গত তিন বছরে সেই প্রাচীরের প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর নিঃশব্দে মুছে গেছে করাত আর আগুনের আঁচড়ে। বন বিভাগের নথিতে ৩৯টি মামলা জমা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু স্থানীয়দের ভাষায় আসল হোতারা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ফাঁকা হয়ে যাওয়া জমিতে গড়ে উঠেছে ধানখেত ও দখলদারের ঘর। উড়িরচরের এই ক্ষত আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় এটি এক বিশাল, ধারাবাহিক বিপর্যয়ের ছোট্ট প্রতিচ্ছবি মাত্র, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ ও পার্বত্য বনাঞ্চল জুড়ে। উপকূলের ম্যানগ্রোভ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর অরণ্য পর্যন্ত তিন দশকের স্যাটেলাইট তথ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। জুম চাষ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক বাগান আর জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশের এই সবুজ ফুসফুস সংকুচিত হচ্ছে এমন এক গতিতে, যার আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য দিতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে।

 

উপকূলীয় বন বিভাগের তথ্য বলছে, সন্দ্বীপ উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচরে গত তিন বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়েছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উড়িরচরে বন ধ্বংসের ঘটনায় ৩৯টি মামলা করা হয়েছে, যার কয়েকটি সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর বন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। শুধু উড়িরচর নয়, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিত্রই ভিন্ন। বিশ্বখ্যাত পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট এর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফডাব্লিউ)’ এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগ প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর গাছপালা হারিয়েছে। একই সময়ে আনুমানিক ১৫০ মেগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ হেক্টর প্রাকৃতিক বনও কমেছে অঞ্চলটিতে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি গাছপালা কমেছে বান্দরবানে। সেখানে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির প্রাণ প্রকৃতি। রাঙামাটিতে ৮৩ হাজার, খাগড়াছড়িতে ৩৬ হাজার, চট্টগ্রাম জেলায় ১৩ হাজার এবং কক্সবাজারে ১১ হাজার হেক্টর জমির গাছপালা কমেছে। অর্থাৎ, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট গাছপালা কমে যাওয়ার বড় অংশই ঘটেছে পার্বত্য তিন জেলায়।

আরও পড়ুনঃ  পত্নীতলায় চুরির রহস্য উদঘাটন, চোরাই মালামাল সহ আটক ২

জিএফডাব্লিউ বলছে, কৃষিজমিতে রূপান্তর ও নতুন বসতি, অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে গাছপালা কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষিজমিতে রূপান্তরের জন্য ৩৪ হাজার হেক্টর, নতুন বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণে ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এবং বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনে ১৯০ হেক্টর জমির বন ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাময়িকভাবে গাছপালা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ জুম চাষ, যাতে ২ লাখ ১০ হাজার হেক্টর বন ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক কাঠ কাটায় ১৪ হাজার হেক্টর এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে ৯৭০ হেক্টর জমির গাছপালা কমেছে। ২০১৭-১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপক আগমন ও কক্সবাজার-বান্দরবানের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণও বন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভাগে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর ভূমিতে নতুন গাছপালা বেড়েছে, এর বিপরীতে একই সময়ে ১ লাখ হেক্টর ভূমিতে গাছপালা কমেছে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট গভীর বনভূমির অংশ ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৬০ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, ৩০ বছরে গভীর বনভূমির অংশ কমেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৯ হেক্টর গভীর বন কমেছে। অর্থাৎ বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই দশকেও প্রাকৃতিক গভীর বন কমার ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বাড়ছে কার্বনগত প্রভাব: খাগড়াছড়িতে বন কমে যাওয়ার কার্বনগত প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের গবেষণায়। ২০২৪ সালে সপ্তম ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিইএসডি)- এ উপস্থাপিত ‘কার্বন কনসিকোয়েন্সেস অব ডিফরেস্টেশন ইন খাগড়াছড়ি অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস: আ জিআইএস অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে খাগড়াছড়িতে বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ শূন্য দশমিক ৩৬ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে কার্বন শোষণ ৫ দশমিক ২৬ মিলিয়ন টন থেকে কমে ১ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন টনে নেমেছে। গবেষণার হিসাবে, ১৯৯০ সালে খাগড়াছড়িতে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন টন নিট কার্বন শোষণ হতো। ২০২০ সালে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গিয়ে বছরে প্রায় ১ দশমিক ১৯ মিলিয়ন টন নিট কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। অর্থাৎ তিন দশকের ব্যবধানে বনভূমি আর নিট কার্বন শোষণের উৎস না থেকে নিট কার্বন নিঃসরণের উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল ‘কার্বন রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমার চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ওই গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্বন স্টোরেজ ছিল ৭৫ হাজার ৬৭৪ মেগাগ্রাম। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৬৯ মেগাগ্রামে। অর্থাৎ ৩০ বছরে কার্বন স্টোরেজ কমেছে ৪ হাজার ১০৫ মেগাগ্রাম। গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৪৩ সালে এটি আরও কমে ৭০ হাজার ২২১ মেগাগ্রামে নামতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  "পবায় ফ্রি টিকায় সুরক্ষিত হচ্ছে ৮৩ হাজার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি, স্বস্তিতে প্রান্তিক খামারিরা"

 

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর বন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৬০ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমেছে। গবেষকদের হিসাবে, এই সময়ে গভীর বন থেকে কৃষি, ঝোপঝাড় ও স্থায়ী বসতিতে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কার্বন সঞ্চয়ের ওপরও। গবেষণায় ২০২৩ থেকে ২০৪৩ সালের মধ্যে কার্বন সঞ্চয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার ২৪৪ মার্কিন ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক গভীর বন ও আর্দ্র প্রাথমিক বনকে কঠোর সুরক্ষার আওতায় আনা, বনভূমি দখল বন্ধ করা, উড়িরচরের মতো উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, পাহাড়ে টেকসই জুম চাষের সময়কাল বাড়ানো এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কার্যকর করা, বন উজাড়ের ঘটনায় প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, শুষ্ক মৌসুমে আগুন নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) ও ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. আল আমিন বলেন, একটি প্রাকৃতিক প্রাথমিক বন হাজার বছরের ইকোসিস্টেমের ফসল। কৃত্রিম বন বা সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী ছোট ছোট গাছপালা বাড়িয়ে উপরিভাগে সবুজের শতকরা হার কিছুটা দেখানো গেলেও তা কখনোই আদিম গভীর বনের বিকল্প হতে পারে না।

আরও পড়ুনঃ  মাদারগঞ্জে নিখোঁজের তিন দিন পর মিলল শিশু শিক্ষার্থী মরিয়মের মাটিচাপা মরদেহ

 

তিনি বলেন, প্রাথমিক বন কাটা পড়লে পাহাড় তার মাটির জৈব শক্তি এবং ভূগর্ভস্থ পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। ফলে বর্ষায় ভয়াবহ ভূমিধস এবং শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে পানিসংকট তৈরি হচ্ছে। অবশিষ্ট প্রাকৃতিক গভীর বনগুলোকে সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে কড়া পাহারা নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, স্যাটেলাইট তথ্যে যে সবুজ অর্জনের বিষয়টি এসেছে, তা আমাদের সামাজিক বনায়ন ও সরকারি বনায়ন কর্মসূচিরও ফল। তবে পাহাড়ে জুম চাষের ঐতিহ্যগত ধরন, দ্রুত নগরায়ণ, সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মতো আকস্মিক চাপের কারণে বনাঞ্চল ধরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় জনবলের সীমাবদ্ধতার সুযোগে অবৈধ কাঠপাচারকারী ও জুমচাষিরা আগুন দিয়ে বন পরিষ্কার করে ফেলে। তবে আমরা এখন স্যাটেলাইটভিত্তিক ডিস্টার্বেন্স অ্যালার্ট ব্যবস্থা জোরদার করেছি। শুষ্ক মৌসুমে আগুনের অ্যালার্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের নিয়ে রেসপন্স করা হচ্ছে। স্থানীয় সমতল ও পাহাড়ি সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে কো-ম্যানেজমেন্ট বা যৌথ বন ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ক্ষয়ে যাওয়া গভীর বনগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনা যায়।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন ৮ জন

২৫ বছরে চট্টগ্রামে কমেছে আড়াই লাখ হেক্টর বনাঞ্চল

আপডেটের সময়: ০৬:২১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ সৈয়দ মিয়া চট্টগ্রাম ব্যুরো: একসময় ঘন সবুজে ঢাকা ছিল সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচর। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করা ম্যানগ্রোভের এক নিবিড় প্রাচীর, যা দ্বীপবাসীকে ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে আগলে রাখত। কিন্তু গত তিন বছরে সেই প্রাচীরের প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর নিঃশব্দে মুছে গেছে করাত আর আগুনের আঁচড়ে। বন বিভাগের নথিতে ৩৯টি মামলা জমা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু স্থানীয়দের ভাষায় আসল হোতারা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ফাঁকা হয়ে যাওয়া জমিতে গড়ে উঠেছে ধানখেত ও দখলদারের ঘর। উড়িরচরের এই ক্ষত আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় এটি এক বিশাল, ধারাবাহিক বিপর্যয়ের ছোট্ট প্রতিচ্ছবি মাত্র, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ ও পার্বত্য বনাঞ্চল জুড়ে। উপকূলের ম্যানগ্রোভ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর অরণ্য পর্যন্ত তিন দশকের স্যাটেলাইট তথ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। জুম চাষ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক বাগান আর জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশের এই সবুজ ফুসফুস সংকুচিত হচ্ছে এমন এক গতিতে, যার আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য দিতে হবে আগামী কয়েক প্রজন্মকে।

 

উপকূলীয় বন বিভাগের তথ্য বলছে, সন্দ্বীপ উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচরে গত তিন বছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়েছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উড়িরচরে বন ধ্বংসের ঘটনায় ৩৯টি মামলা করা হয়েছে, যার কয়েকটি সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর বন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। শুধু উড়িরচর নয়, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিত্রই ভিন্ন। বিশ্বখ্যাত পরিবেশ গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট এর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফডাব্লিউ)’ এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগ প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর গাছপালা হারিয়েছে। একই সময়ে আনুমানিক ১৫০ মেগাটন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ হেক্টর প্রাকৃতিক বনও কমেছে অঞ্চলটিতে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি গাছপালা কমেছে বান্দরবানে। সেখানে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির প্রাণ প্রকৃতি। রাঙামাটিতে ৮৩ হাজার, খাগড়াছড়িতে ৩৬ হাজার, চট্টগ্রাম জেলায় ১৩ হাজার এবং কক্সবাজারে ১১ হাজার হেক্টর জমির গাছপালা কমেছে। অর্থাৎ, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট গাছপালা কমে যাওয়ার বড় অংশই ঘটেছে পার্বত্য তিন জেলায়।

আরও পড়ুনঃ  নদীর পাড় ধসে নিখোঁজ বিজিবি সদস্যের মরদেহ উদ্ধার

জিএফডাব্লিউ বলছে, কৃষিজমিতে রূপান্তর ও নতুন বসতি, অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে গাছপালা কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে কৃষিজমিতে রূপান্তরের জন্য ৩৪ হাজার হেক্টর, নতুন বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণে ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এবং বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনে ১৯০ হেক্টর জমির বন ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাময়িকভাবে গাছপালা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ জুম চাষ, যাতে ২ লাখ ১০ হাজার হেক্টর বন ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক কাঠ কাটায় ১৪ হাজার হেক্টর এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে ৯৭০ হেক্টর জমির গাছপালা কমেছে। ২০১৭-১৮ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপক আগমন ও কক্সবাজার-বান্দরবানের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণও বন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভাগে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর ভূমিতে নতুন গাছপালা বেড়েছে, এর বিপরীতে একই সময়ে ১ লাখ হেক্টর ভূমিতে গাছপালা কমেছে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট গভীর বনভূমির অংশ ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৬০ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, ৩০ বছরে গভীর বনভূমির অংশ কমেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৯ হেক্টর গভীর বন কমেছে। অর্থাৎ বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই দশকেও প্রাকৃতিক গভীর বন কমার ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বাড়ছে কার্বনগত প্রভাব: খাগড়াছড়িতে বন কমে যাওয়ার কার্বনগত প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের গবেষণায়। ২০২৪ সালে সপ্তম ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিইএসডি)- এ উপস্থাপিত ‘কার্বন কনসিকোয়েন্সেস অব ডিফরেস্টেশন ইন খাগড়াছড়ি অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস: আ জিআইএস অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে খাগড়াছড়িতে বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ শূন্য দশমিক ৩৬ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ১৮ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে কার্বন শোষণ ৫ দশমিক ২৬ মিলিয়ন টন থেকে কমে ১ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন টনে নেমেছে। গবেষণার হিসাবে, ১৯৯০ সালে খাগড়াছড়িতে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন টন নিট কার্বন শোষণ হতো। ২০২০ সালে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গিয়ে বছরে প্রায় ১ দশমিক ১৯ মিলিয়ন টন নিট কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। অর্থাৎ তিন দশকের ব্যবধানে বনভূমি আর নিট কার্বন শোষণের উৎস না থেকে নিট কার্বন নিঃসরণের উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল ‘কার্বন রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কার্বন সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমার চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ওই গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্বন স্টোরেজ ছিল ৭৫ হাজার ৬৭৪ মেগাগ্রাম। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৬৯ মেগাগ্রামে। অর্থাৎ ৩০ বছরে কার্বন স্টোরেজ কমেছে ৪ হাজার ১০৫ মেগাগ্রাম। গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৪৩ সালে এটি আরও কমে ৭০ হাজার ২২১ মেগাগ্রামে নামতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  শালিখায় রাতুল নামে এক কিশোর নিখোঁজ

 

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর বন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৬০ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমেছে। গবেষকদের হিসাবে, এই সময়ে গভীর বন থেকে কৃষি, ঝোপঝাড় ও স্থায়ী বসতিতে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কার্বন সঞ্চয়ের ওপরও। গবেষণায় ২০২৩ থেকে ২০৪৩ সালের মধ্যে কার্বন সঞ্চয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার ২৪৪ মার্কিন ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক গভীর বন ও আর্দ্র প্রাথমিক বনকে কঠোর সুরক্ষার আওতায় আনা, বনভূমি দখল বন্ধ করা, উড়িরচরের মতো উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, পাহাড়ে টেকসই জুম চাষের সময়কাল বাড়ানো এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কার্যকর করা, বন উজাড়ের ঘটনায় প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, শুষ্ক মৌসুমে আগুন নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) ও ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. আল আমিন বলেন, একটি প্রাকৃতিক প্রাথমিক বন হাজার বছরের ইকোসিস্টেমের ফসল। কৃত্রিম বন বা সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ক্ষণস্থায়ী ছোট ছোট গাছপালা বাড়িয়ে উপরিভাগে সবুজের শতকরা হার কিছুটা দেখানো গেলেও তা কখনোই আদিম গভীর বনের বিকল্প হতে পারে না।

আরও পড়ুনঃ  মাদারগঞ্জে নিখোঁজের তিন দিন পর মিলল শিশু শিক্ষার্থী মরিয়মের মাটিচাপা মরদেহ

 

তিনি বলেন, প্রাথমিক বন কাটা পড়লে পাহাড় তার মাটির জৈব শক্তি এবং ভূগর্ভস্থ পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। ফলে বর্ষায় ভয়াবহ ভূমিধস এবং শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে পানিসংকট তৈরি হচ্ছে। অবশিষ্ট প্রাকৃতিক গভীর বনগুলোকে সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে কড়া পাহারা নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, স্যাটেলাইট তথ্যে যে সবুজ অর্জনের বিষয়টি এসেছে, তা আমাদের সামাজিক বনায়ন ও সরকারি বনায়ন কর্মসূচিরও ফল। তবে পাহাড়ে জুম চাষের ঐতিহ্যগত ধরন, দ্রুত নগরায়ণ, সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মতো আকস্মিক চাপের কারণে বনাঞ্চল ধরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় জনবলের সীমাবদ্ধতার সুযোগে অবৈধ কাঠপাচারকারী ও জুমচাষিরা আগুন দিয়ে বন পরিষ্কার করে ফেলে। তবে আমরা এখন স্যাটেলাইটভিত্তিক ডিস্টার্বেন্স অ্যালার্ট ব্যবস্থা জোরদার করেছি। শুষ্ক মৌসুমে আগুনের অ্যালার্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের নিয়ে রেসপন্স করা হচ্ছে। স্থানীয় সমতল ও পাহাড়ি সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে কো-ম্যানেজমেন্ট বা যৌথ বন ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ক্ষয়ে যাওয়া গভীর বনগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনা যায়।