
রিজন আহমেদ মোস্তফা, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজের মা হালিমা (৬৫) হত্যার অভিযোগে মেয়ে ও মামলার বাদী চাম্পাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘদিনের রহস্যজনক এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই কিশোরগঞ্জের পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলম। ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সিন্ধ্রীপ গ্রামের হালিমাকে হত্যা করা হয়। পরদিন বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ উত্তরে একটি পতিত জমি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পোঁতা ছিল। গলায় সাদা রশি প্যাঁচানো এবং মুখে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনার পর নিহতের মেয়ে চাম্পা বাদী হয়ে প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করে করিমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি পরবর্তী সময়ে তদন্তের জন্য পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা গ্রহণ করে। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর পিবিআই কিশোরগঞ্জের পুলিশ পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলম ইন্সপেক্টর বাংলাদেশ পুলিশ তদন্তের কাজ শুরু করে। তদন্তের শুরু থেকেই ঘটনাটির বিভিন্ন দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তদন্তের একপর্যায়ে মামলার বাদী চাম্পার কথাবার্তা ও বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে অসংগতি নজরে আসে তদন্ত দলের। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে বলে জানিয়েছে পিবিআই। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর আগে জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে হালিমা ও প্রতিবেশী বিল্লালের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে ওই জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা ও বিরোধ আরও তীব্র হয়। ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বিল্লাল হালিমাকে মারধর করেন এবং পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, মাকে হত্যার পর প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হালিমাকে মীমাংসার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে হত্যা করে মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়।
পরদিন চাম্পা নিজেই বাদী হয়ে বিল্লালসহ অন্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। তদন্তের ধারাবাহিকতায় চাম্পাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১৮ আগস্ট কিশোরগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম বুলবুলের আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। জটিল মামলায় ধৈর্য ও মেধার পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বাধীন তদন্ত দলের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মামলার প্রাথমিক অভিযোগের বাইরে গিয়ে ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা, বাদীর বক্তব্যের অসংগতি শনাক্ত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দিকে এগিয়ে যায় তদন্ত। আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু অভিযোগের ওপর নির্ভর না করে ঘটনাটির প্রতিটি সম্ভাব্য দিক যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে তদন্ত দলের দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার ফলেই ঘটনার নেপথ্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে বলে পিবিআই জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে পিবিআই কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ। এ সময় পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলম, পরিদর্শক খাইরুল বাসার ও পরিদর্শক নবী হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলার রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারী কর্মকর্তা আশরাফুল আলমের পেশাদারিত্ব, ধৈর্য ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের সক্ষমতা পিবিআইয়ের তদন্ত কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রতিবেদকের নাম 


















