Dhaka ০৪:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ভাঙ্গায় বাস–ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত, ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেফতার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত বাঁশখালী পৌরসভায় গভীর রাতে সাংবাদিকের পৈত্রিক জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ফরিদপুরে সনাকের মানববন্ধন ফরিদপুরে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু হাসপাতালে দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে দুইশো বছরের পুরোনো চাম্বলের সিমাই খাল কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি। কাউনিয়ায় ব্র্যাকের ‘স্বপ্নসারথি’ কিশোরীদের ১ম পর্বের সমাপনী ও সনদ বিতরণ

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে দুইশো বছরের পুরোনো চাম্বলের সিমাই খাল

মোঃ সৈয়দ মিয়া (ব্যুরো চিফ চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের প্রায় দুইশো বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সিমাই খাল এখন দখল, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে। একসময় নৌযান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই খাল বর্তমানে ময়লার ভাগাড় ও অবৈধ স্থাপনার দখলে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে আশপাশের হাজারো পরিবারকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ব চাম্বলের দক্ষিণ ইজ্জতিয়া ব্রিজ এলাকা থেকে বাংলাবাজারের জলকদর খাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল অতীতে ছিল এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক নৌপথ। কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ীসহ উপকূলীয় এলাকার ব্যবসায়ীরা নৌকা ও সাম্পানে করে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করতেন এ খালপথে। নিয়মিত জোয়ার-ভাটার প্রবাহ থাকলেও সময়ের ব্যবধানে দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে খালটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  বগুড়ায় উন্নয়নের নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরলেন প্রতিমন্ত্রী: মীর শাহে আলম

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, চাম্বল পাহাড়ের পাদদেশ থেকে জলকদর খাল পর্যন্ত বিস্তৃত সিমাই খালটি ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষের বর্ষার পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। খালটি চাম্বল বাজার অতিক্রম করে বাঁশখালী প্রধান সড়কের নিচ দিয়ে জলকদর খালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চাম্বল বাজার এলাকায় প্রধান সড়কের সেতুর উভয় পাশে খালের বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে দোকানঘর ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত খালে ফেলা হচ্ছে। এতে খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে পানি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের পশ্চিমাংশের মুখও বিভিন্নভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের বসতবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ রশিদ আহমদ বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক খাল। একসময় এখানে নৌকা ও সাম্পানের ব্যাপক চলাচল ছিল। এখন খালটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি বর্ষায় তিন হাজারের বেশি কৃষকের জমি পানির নিচে চলে যায় এবং অনেক পরিবারের ঘরবাড়িতেও পানি উঠে।

আরও পড়ুনঃ  শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বম শরণার্থীদের পুনর্বাসনের অঙ্গীকার ৫৬ পরিবারে খাদ্য সহায়তা

স্থানীয় বাসিন্দা জাকের হোসেন ও আলী নেওয়াজ চৌধুরী জানান, বাজারের ময়লা-আবর্জনার কারণে খালে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে এলাকাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একই সঙ্গে মশা-মাছির উপদ্রবও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

আরেক বাসিন্দা মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, বাজারের ইজারাদার ইজারার শর্ত অমান্য করে খালে ময়লা ফেলছেন। এর ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, খালের দুই পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানঘর ও স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন কার্যক্রম হাতে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুনঃ  থানার ভল্টে সমিতির টাকা, চরম দুর্ভোগে আমানতকারীরা..

চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদ উল্লাহ বলেন, “বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিতে কয়েক হাজার মানুষের ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খালটি দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, সরকারি খাল দখল ও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত দখলমুক্তকরণ, ময়লা ফেলা বন্ধ এবং পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলে শতবর্ষী সিমাই খাল তার হারানো প্রাণ ফিরে পাবে এবং জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকেও মুক্তি মিলবে হাজারো মানুষের।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

ভাঙ্গায় বাস–ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত,

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে দুইশো বছরের পুরোনো চাম্বলের সিমাই খাল

আপডেটের সময়: ১০:১২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

মোঃ সৈয়দ মিয়া (ব্যুরো চিফ চট্টগ্রাম)

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়নের প্রায় দুইশো বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সিমাই খাল এখন দখল, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে। একসময় নৌযান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই খাল বর্তমানে ময়লার ভাগাড় ও অবৈধ স্থাপনার দখলে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে আশপাশের হাজারো পরিবারকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ব চাম্বলের দক্ষিণ ইজ্জতিয়া ব্রিজ এলাকা থেকে বাংলাবাজারের জলকদর খাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল অতীতে ছিল এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক নৌপথ। কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ীসহ উপকূলীয় এলাকার ব্যবসায়ীরা নৌকা ও সাম্পানে করে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করতেন এ খালপথে। নিয়মিত জোয়ার-ভাটার প্রবাহ থাকলেও সময়ের ব্যবধানে দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে খালটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  কোচিং থেকে ফেরার পথে ঝরল প্রাণ: রাণীশংকৈলে ট্রলি চাপায় স্কুলছাত্রীর করুণ মৃত্যু

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, চাম্বল পাহাড়ের পাদদেশ থেকে জলকদর খাল পর্যন্ত বিস্তৃত সিমাই খালটি ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষের বর্ষার পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। খালটি চাম্বল বাজার অতিক্রম করে বাঁশখালী প্রধান সড়কের নিচ দিয়ে জলকদর খালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চাম্বল বাজার এলাকায় প্রধান সড়কের সেতুর উভয় পাশে খালের বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে দোকানঘর ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত খালে ফেলা হচ্ছে। এতে খালের বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে পানি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের পশ্চিমাংশের মুখও বিভিন্নভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের বসতবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ রশিদ আহমদ বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক খাল। একসময় এখানে নৌকা ও সাম্পানের ব্যাপক চলাচল ছিল। এখন খালটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি বর্ষায় তিন হাজারের বেশি কৃষকের জমি পানির নিচে চলে যায় এবং অনেক পরিবারের ঘরবাড়িতেও পানি উঠে।

আরও পড়ুনঃ  চট্টগ্রামে চার বছরের শিশু ধর্ষণের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

স্থানীয় বাসিন্দা জাকের হোসেন ও আলী নেওয়াজ চৌধুরী জানান, বাজারের ময়লা-আবর্জনার কারণে খালে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে এলাকাবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একই সঙ্গে মশা-মাছির উপদ্রবও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

আরেক বাসিন্দা মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, বাজারের ইজারাদার ইজারার শর্ত অমান্য করে খালে ময়লা ফেলছেন। এর ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, খালের দুই পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানঘর ও স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন কার্যক্রম হাতে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুনঃ  ঘোড়াঘাটে ফুফাতো বোনের সঙ্গে জাম কুড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদ উল্লাহ বলেন, “বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিতে কয়েক হাজার মানুষের ফসলি জমি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খালটি দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, সরকারি খাল দখল ও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত দখলমুক্তকরণ, ময়লা ফেলা বন্ধ এবং পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলে শতবর্ষী সিমাই খাল তার হারানো প্রাণ ফিরে পাবে এবং জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকেও মুক্তি মিলবে হাজারো মানুষের।