
অপু দাস, রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে অটোপাসের পর এবারই বোর্ডটির পাসের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
তবে সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হলেও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ অর্জন—উভয় ক্ষেত্রেই ছেলেদের তুলনায় ভালো ফল করেছে মেয়েরা। এ বছর মোট ৪ হাজার ৫২০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে মেয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৫৫ জন, আর ছেলে ১ হাজার ৯৬৫ জন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন আনুষ্ঠানিকভাবে এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করেন। বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তবে তাদের মধ্যে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। বাকি ৭৫ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৭৪৩টি কলেজের শিক্ষার্থীরা এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিভাগের বিভিন্ন কেন্দ্রে মোট ২০৮টি পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যের ব্যবধান বেশ উল্লেখযোগ্য। ছেলেদের পাসের হার ৩৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিপরীতে মেয়েদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।
জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও মেয়েদের আধিপত্য দেখা গেছে। এ বছর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মোট ৪ হাজার ৫২০ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফলাফল জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৬৫ জন ছেলে এবং ২ হাজার ৫৫৫ জন মেয়ে। পাসের হার ও সর্বোচ্চ জিপিএ অর্জন—দুই সূচকেই মেয়েদের এগিয়ে থাকার বিষয়টি এবারের ফলাফলে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
পরীক্ষা চলাকালে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে ৩১ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন। তিনি আরও জানান, এ বছর রাজশাহী বিভাগের আট জেলার মধ্যে মাত্র ৯টি কলেজের সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ৩৯টি কলেজের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। ফলে একদিকে যেমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ সাফল্য এসেছে, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক হয়েছে।
বোর্ডের বিগত কয়েক বছরের ফলাফলের সঙ্গে চলতি বছরের ফলাফল তুলনা করলে পাসের হার কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে শতভাগ শিক্ষার্থীকে পাস ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তী বছর ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ৬০ শতাংশে। ২০২৩ সালে পাসের হার আরও কমে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ হয়। তবে ২০২৪ সালে কিছুটা উন্নতি হয়ে পাসের হার দাঁড়িয়েছিল ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশে।
কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। চলতি বছর তা আরও ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার বোর্ডের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।
ফলাফলের এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, পরীক্ষার্থীরা উত্তরপত্রে যে ধরনের উত্তর লিখেছে, মূল্যায়নের সময় সে অনুযায়ীই নম্বর দেওয়া হয়েছে। কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়নের কারণেই সামগ্রিক ফলাফলে এর প্রভাব পড়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া এবং ৩৯টি কলেজের কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার বিষয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অন্যদিকে পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েদের এগিয়ে থাকা এবারের ফলাফলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদকের নাম 


















