
পত্নীতলা (নওগাঁ) প্রতিনিধি: কষ্টের ঘাম আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, ধানের শীষে হাসছে কৃষকের মুখ—ভালো ফসলের আশায় বুক বাঁধছেন হাজারো কৃষক।
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন প্রকৃতির এক অপরূপ দৃশ্য। যে মাঠে কিছুদিন আগেও ছিল সবুজের সমরোহ, সময়ের পরিক্রমায় সেই মাঠ এখন ধারণ করেছে সোনালী রং। বাতাসে দুলছে পাকা ধানের শীষ। কৃষকের ফুটে উঠেছে স্বপ্নের হাসি। কয়েক মাসের পরিশ্রম, রোদ-বৃষ্টি অপেক্ষা করে মাঠে পড়ে থাকা, সেচ, সার,কীটনাশক ও পরিচর্যার পর এখন সে কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তোলার অপেক্ষায় কৃষক।
পত্নীতলা গ্রাম অঞ্চলের মাঠে মাঠে এখন ধান পাকার দৃশ্য বিরাজমান। কোথাও ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা। আবার কোথাও কৃষকরা পাকা ধানের শিষ হাতে নিয়ে ফলনের হিসাব করছেন। তাদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আর কয়েকদিনের মধ্যে সোনালী ধান উঠবে কৃষকের গোলায়। এ যেন শুধু ধান কাটার মৌসুম নয়, বরং কৃষকের জীবনের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখার সময়।
উপজেলা কৃষি অফিসার সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২৭ মৌসুমে পত্নীতলা উপজেলায় প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।১১ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা জুড়ে চলে আমন চাষ।
এবার ব্রি ধান-৮৬,ব্রি ধান-৮৫,ব্রি ধান-১০৩,বিনা -১৭ ও শ্বর্ণা-৫ জাতের ধান সহ বিভিন্ন জাতের আমন ধান আবাদ হয়েছে। সরকারি প্রনোদনায় আওতায় ৪১০০ জন প্রান্তিক কৃষক কে ধানের বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার দেওয়া হয়েছে।
কৃষকের কাছে এ ফসল শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সারা বছরের সংসার খরচ, সন্তানদের পড়াশুনা, ঋণ পরিশোধ, পরিবারের চিকিৎসা এবং আগামী দিনের জীবনযাত্রার হিসাব।
বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) গত ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নওগাঁ জেলার যে কৃষি আবহাওয়া প্রকাশ করেছে,তাতে ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পযর্ন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১.৫ থেকে ৩২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ সময়ে বৃষ্টিপাত ছিল সীমিত।
৮ নভেম্বর থেকে পরবর্তী কয়েকদিন আবহাওয়া তুলনামূল শুষ্ক থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। তবে ১০ নভেম্বরের দিকে বৃষ্টির সম্ভাবনার পূর্বাভাস ভিত্তিক একটি সূত্র জানায়। তাই ধান কাটা, ধান মাড়ায় ও শুকনোর ক্ষেত্রে কৃষকদের আবহাওয়ার দিকে নজর রাখতে হবে।
কৃষকের জন্য পরামর্শ হলো, পাকা ধান বেশি দিন জমিতে ফেলে না রেখে উপযুক্ত সময় কেটে নিতে হবে। মাড়ায়ের পর ধান ভালোভাবে শুকিয়ে নিরাপদ ও শুকনোস্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে কাটা ধান খোলা মাঠে ফেলে রাখা উচিত নয়।
নজিপুর ইউনিয়নের পদ্মপুকুর গ্রামের কৃষক মোঃ আব্দুল সামাদ (২৮) তিনি জানান, প্রায় তিন বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। তবে সারসংকট ও বেশি দামে সার কিনার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন তিনি।
এ বাস্তবতাই পত্নীতলার অনেক কৃষকের জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভালো ফলন হলেই ভালো লাভ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ধানের উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, স্যার, কীটনাশক, সেচ ও পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে হাতে কত টাকা থাকবে, সেটি এখন বড় হিসাব। কৃষকের স্বপ্ন একটাই এবার যেন পরিশ্রমের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়।
পত্নীতলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ সেহরাব হোসেন বলেন, কৃষকদের রোগ বালাই দমনে আইপিএম পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, লিফলেট বিতরণ, উঠান বৈঠক, কৃষক সমাবেশ ও মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন,আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন পাওয়া সম্ভব হবে এবার।
পত্নীতলার মাঠে মাঠে এখন কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। ধানের শীষ যত পরিপক্ক হচ্ছে, ততই বাড়ছে কৃষকের প্রত্যাশা। কয়েক মাসের কষ্টের পর যখন গোলাভরা ধান ঘরে উঠবে, তখনই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন তাঁরা।
কৃষকের কাছে সোনালি ধান মানে শুধু ফসল নয়, এটি বেচেঁ থাকার অবলম্বন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর উপায় এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।
কৃযকের প্রত্যাশা, প্রকৃতি সহায় হয়, ধান যেন নিরাপদে ঘরে ওঠে এবং উৎপাদিত ফসলের নায্যমুল্য যেন তাঁরা পান।
মাঠের সবুজ যখন সোনালি হয়ে ওঠে, তখন শুধু প্রকৃতির রং বদলায় না—বদলে যায় কৃষকের স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর আাগামীর বেঁচে থাকার গল্প।
প্রতিবেদকের নাম 



















