
আরিফ ইসলাম আলাল, ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নে কৃষকের তীব্র সার সংকটের মাঝেই সরকারি ইউরিয়া সার নিয়ে রহস্যজনক জালিয়াতির খবর পাওয়া গেছে। ভোররাতে পাচারের সময় স্থানীয়দের হাতে ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার আটক হলেও তা ইউনিয়ন পরিষদের হেফাজতে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত এক বালাইনাশক ব্যবসায়ীর দোকানে উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্যদের বিরুদ্ধে ৪৮ হাজার টাকার বিনিময়ে সার পাচারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
ঘটনা প্রবাহ ও আটক সার উধাও
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভোরে খগারহাট বাজারে চারটি অটো মিশুকযোগে ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার উত্তর দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। চালকেরা সারের বৈধ ভাউচার ও ডিলারের তথ্য দিতে না পারায় স্থানীয় নাইটগার্ড ও বাসিন্দারা গাড়িগুলো আটক করেন। খবর পেয়ে গ্রাম পুলিশ আব্দুল করিম ও আমের আলী এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর হক, নুরুল ইসলাম ও মফিজার রহমান দিলিপ ঘটনাস্থলে যান। ইউপি সদস্য নুর হক উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন যে সারগুলো ইউনিয়ন পরিষদে জমা রাখা হবে এবং পরবর্তীতে নথিপত্র যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সার ইউনিয়ন পরিষদে না নিয়ে টুনিরহাটের ‘মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্স’ নামক একটি বালাইনাশক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আব্দুর রহমান ১৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-র কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরা ৪৮ হাজার টাকা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে আটককৃত সারগুলো পাচার করে দিয়েছেন।
পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও সন্দেহ
গ্রাম পুলিশ: গ্রাম পুলিশ আব্দুল করিম ও আমের আলী জানান, তারা সারগুলো ইউনিয়ন পরিষদের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইউপি সদস্যদের নির্দেশেই পরে সেগুলো টুনিরহাটের ব্যবসায়ী হাচানুল আলমের দোকানে নামিয়ে দেওয়া হয়।
দোকান মালিক: মেসার্স ইব্রাহিম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোঃ হাচানুল আলম দাবি করেন, সারগুলো বগুড়া থেকে তার নিজের আনা। তবে ক্রয় রশিদ, চালান বা বৈধ কোনো ভাউচার তিনি দেখাতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি ৫০ বস্তা সার নিজের এবং বাকি ৫০ বস্তা অন্য ব্যবসায়ীর বলে দাবি করলেও সেই ব্যবসায়ীর পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান।
ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান: অভিযুক্ত ইউপি সদস্য নুর হক দাবি করেন—যার সার তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম ও মফিজার রহমান দিলিপ বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং প্যানেল চেয়ারম্যান দুলু মেম্বারের সাথে কথা বলতে বলেন। তবে প্যানেল চেয়ারম্যান দুলু মেম্বার এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
কৃষকদের ক্ষোভ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
মাঠপর্যায়ে সার না পেয়ে কৃষকরা যখন চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন, তখন রাতের আঁধারে ভাউচার ছাড়া বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া পরিবহনে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মনিরুল ইসলামসহ ডিমলার কৃষকরা দ্রুত এই সার সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য:
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইমরানুজ্জামান জানান, অভিযোগটি পাওয়ার পর তা তদন্তের জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং দু-এক দিনের মধ্যে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদসহ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল ১০০ বস্তা সার আটকের বিষয় নয়; এর সাথে ডিমলার কৃষি ব্যবস্থা, সরকারি বরাদ্দের স্বচ্ছতা এবং কৃষকের অধিকার জড়িত। আজ ২৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) পর্যন্ত অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ কৃষক ও সচেতন মহল নিরপেক্ষ সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে এই অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছেন।
প্রতিবেদকের নাম 


















