Dhaka ০৫:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
তেলের দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ে কমলে আর কমে না নবাবগঞ্জের শালখুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা যশোরের শার্শায় জমকালো আয়োজনে ১৬ দলীয় কাবাডি টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করা হয়েছে। বৃহত্তর রংপুরের ৫ জেলার চরে বদলে যাবে কৃষকের ভাগ্য রোগ প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গড়ছে বাংলাদেশ: ডা. জুবাইদা নেতানিয়াহু মঞ্চে উঠতেই বিশ্ব নেতাদের ওয়াকআউট সবজির বাজারে আগুন, ঘি ঢালছে জ্বালানি তেলের দাম বালু উত্তোলনে নদীভাঙনের আতঙ্কে বসতভিটাও হারাচ্ছে নদীপারের বাসিন্দারা টিম জার্নালিস্ট’সে আইন পরামর্শক হিসেবে হাইকোর্টের আইনজীবী মোস্তফা মহসিনের যোগদান* কক্সবাজারের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে: মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী

বালু উত্তোলনে নদীভাঙনের আতঙ্কে বসতভিটাও হারাচ্ছে নদীপারের বাসিন্দারা

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৪:২০:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৯ সময় দেখুন

ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ একসময় যে জমিতে শোভা পেত সবুজ ধান ও পাটের ক্ষেত, সেখানে আজ শুধুই মধুমতি নদীর উত্তাল স্রোত। যে উঠানে ছিল কর্মমুখর সংসারের কোলাহল, নদীভাঙনের আতঙ্কে সেই বসতভিটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে শত শত মানুষকে। বছরের পর বছর মধুমতির আগ্রাসী ভাঙনে এভাবেই বদলে গেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচর নীচুপাড়ার সার্বিক চিত্র। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব নদীপারের মানুষজন এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনকে দায়ী করছেন। স্থানীয়দের দাবি, মধুমতির অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যেই লংকারচর নীচুপাড়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। অবশিষ্ট সামান্য ভূখণ্ডও এখন তীব্র ভাঙনের মুখে। ফলে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রতিদিন উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপারের হাজারো মানুষ। শুধু বসতবাড়ি বা কৃষিজমিই নয়, নদীর হিংস্র থাবা কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবিকার মূল অবলম্বনও। ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে সড়কের পাশে বা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাঙনকবলিত এলাকার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ভয়াবহ বাস্তব চিত্র উঠে আসে স্থানীয় বাসিন্দা আরতী গোয়ালীর কথায়।

আরও পড়ুনঃ  বুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসে যাচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ

 

 

প্রায় ৩০ বছর আগে বিয়ের পর থেকেই এলাকাটিতে নদীর তাণ্ডব দেখে আসছেন তিনি। আরতী জানান, প্রতিবছরই একটু একটু করে তাদের স্বাবলম্বী পরিবারের সব সম্পত্তি নদী গিলে খেয়েছে। একসময়ের প্রাচুর্যময় পরিবারটি আজ প্রায় ভূমিহীন। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে সামান্য জায়গা কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন তারা। মধুমতি থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই প্রতি বর্ষায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরেজমিন লংকারচর নীচুপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তীরের কয়েকটি পয়েন্টে নতুন করে পাড়ধস শুরু হয়েছে। বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীসংলগ্ন বসতভিটা ও কৃষিজমি বিলীন হওয়ার আতঙ্কে আছে সবাই। স্থানীয়দের তথ্যমতে- ইতোমধ্যে আরতী গোয়ালী, বিধান বদ্দী, হরশিত, ননী, অচিন্ত গোয়ালী, জীবানন গোয়ালী, রঘুনাথ মন্ডল ও আনিতা মন্ডলসহ প্রায় ৫০-৬০টি পরিবারের বসতভিটা ও একর একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। জমি হারিয়ে চরম সংকটে পড়া পরিবারগুলোর জীবিকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  নগরকান্দায় অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে কারাদন্ড প্রদান

 

 

ভুক্তভোগী আনিতা মন্ডল জানান, নদী সব কেড়ে নেওয়ায় সরকারি সহায়তায় পাওয়া ভেড়া পালন করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। খাবারের সন্ধানে নিজেই নৌকা চালিয়ে এক চর থেকে অন্য চরে ঘুরতে হয় তাকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আগে যে জমিতে সবুজ ফসল ফলাতাম, তা এখন নদীর পেটে। নদী এভাবে জমি কেড়ে নিলে আমরা যাব কোথায়?’ অন্য বাসিন্দা রঘুনাথ মন্ডল জানান, নদী থেকে দূরে সরতে সরতে তারা এখন প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছেন, আর পিছিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বালু উত্তোলনের এই অপকর্মের বিষয়ে ঘোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন নবাব বলেন, ‘ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এর জন্য অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনই মূলত দায়ী।’ নিয়ম-নীতি মেনে বালু তোলা হলে এ ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম রকিবুল হাসান জানান, পাশের মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক বসিয়ে নদীশাসনের কাজ করছে।

আরও পড়ুনঃ  নবাবগঞ্জের শালখুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা

 

 

বোয়ালমারী অংশে কোনো নতুন ভাঙন দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো। তাদের প্রশ্ন- সবকিছু নদীতে বিলীন হওয়ার পর ব্যবস্থা নিয়ে কী লাভ? নদীপারের বাসিন্দাদের একটাই দাবি, জমি ও ভিটেমাটি রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে স্থায়ী নদীশাসন ও সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হোক।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

তেলের দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ে কমলে আর কমে না

বালু উত্তোলনে নদীভাঙনের আতঙ্কে বসতভিটাও হারাচ্ছে নদীপারের বাসিন্দারা

আপডেটের সময়: ০৪:২০:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ একসময় যে জমিতে শোভা পেত সবুজ ধান ও পাটের ক্ষেত, সেখানে আজ শুধুই মধুমতি নদীর উত্তাল স্রোত। যে উঠানে ছিল কর্মমুখর সংসারের কোলাহল, নদীভাঙনের আতঙ্কে সেই বসতভিটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে শত শত মানুষকে। বছরের পর বছর মধুমতির আগ্রাসী ভাঙনে এভাবেই বদলে গেছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের লংকারচর নীচুপাড়ার সার্বিক চিত্র। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব নদীপারের মানুষজন এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনকে দায়ী করছেন। স্থানীয়দের দাবি, মধুমতির অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যেই লংকারচর নীচুপাড়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। অবশিষ্ট সামান্য ভূখণ্ডও এখন তীব্র ভাঙনের মুখে। ফলে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রতিদিন উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপারের হাজারো মানুষ। শুধু বসতবাড়ি বা কৃষিজমিই নয়, নদীর হিংস্র থাবা কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবিকার মূল অবলম্বনও। ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে সড়কের পাশে বা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাঙনকবলিত এলাকার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ভয়াবহ বাস্তব চিত্র উঠে আসে স্থানীয় বাসিন্দা আরতী গোয়ালীর কথায়।

আরও পড়ুনঃ  পত্নীতলায় ডেঙ্গুবিরোধী কর্মসূচিতে যুবদলের ব্যাপক অংশগ্রহণ

 

 

প্রায় ৩০ বছর আগে বিয়ের পর থেকেই এলাকাটিতে নদীর তাণ্ডব দেখে আসছেন তিনি। আরতী জানান, প্রতিবছরই একটু একটু করে তাদের স্বাবলম্বী পরিবারের সব সম্পত্তি নদী গিলে খেয়েছে। একসময়ের প্রাচুর্যময় পরিবারটি আজ প্রায় ভূমিহীন। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে সামান্য জায়গা কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন তারা। মধুমতি থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই প্রতি বর্ষায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরেজমিন লংকারচর নীচুপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তীরের কয়েকটি পয়েন্টে নতুন করে পাড়ধস শুরু হয়েছে। বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীসংলগ্ন বসতভিটা ও কৃষিজমি বিলীন হওয়ার আতঙ্কে আছে সবাই। স্থানীয়দের তথ্যমতে- ইতোমধ্যে আরতী গোয়ালী, বিধান বদ্দী, হরশিত, ননী, অচিন্ত গোয়ালী, জীবানন গোয়ালী, রঘুনাথ মন্ডল ও আনিতা মন্ডলসহ প্রায় ৫০-৬০টি পরিবারের বসতভিটা ও একর একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। জমি হারিয়ে চরম সংকটে পড়া পরিবারগুলোর জীবিকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  মাদারগঞ্জে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ নারী আটক, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৩ মাসের কারাদণ্ড

 

 

ভুক্তভোগী আনিতা মন্ডল জানান, নদী সব কেড়ে নেওয়ায় সরকারি সহায়তায় পাওয়া ভেড়া পালন করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। খাবারের সন্ধানে নিজেই নৌকা চালিয়ে এক চর থেকে অন্য চরে ঘুরতে হয় তাকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আগে যে জমিতে সবুজ ফসল ফলাতাম, তা এখন নদীর পেটে। নদী এভাবে জমি কেড়ে নিলে আমরা যাব কোথায়?’ অন্য বাসিন্দা রঘুনাথ মন্ডল জানান, নদী থেকে দূরে সরতে সরতে তারা এখন প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছেন, আর পিছিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বালু উত্তোলনের এই অপকর্মের বিষয়ে ঘোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন নবাব বলেন, ‘ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এর জন্য অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনই মূলত দায়ী।’ নিয়ম-নীতি মেনে বালু তোলা হলে এ ক্ষতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম রকিবুল হাসান জানান, পাশের মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক বসিয়ে নদীশাসনের কাজ করছে।

আরও পড়ুনঃ  টিকিটবিহীন যাত্রীদের উপদ্রবে এসি বগিও যেন গোয়ালঘর: পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী ‘একতা এক্সপ্রেস’-এর করুণ চিত্র।

 

 

বোয়ালমারী অংশে কোনো নতুন ভাঙন দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশাসনের এমন আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো। তাদের প্রশ্ন- সবকিছু নদীতে বিলীন হওয়ার পর ব্যবস্থা নিয়ে কী লাভ? নদীপারের বাসিন্দাদের একটাই দাবি, জমি ও ভিটেমাটি রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে স্থায়ী নদীশাসন ও সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হোক।