Dhaka ১২:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোথায় চড়ুইয়ের সেই কিচিরমিচির

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৬:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৪ সময় দেখুন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সকাল হলেই একসময় শোনা যেত চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। জানালার কার্নিশ, বারান্দার রেলিং কিংবা ছাদের কোণে দল বেঁধে বসত ছোট্ট পাখিগুলো। কেউ খাবার খুঁজত, কেউ বাসার জন্য খড়কুটো জড়ো করত। তাদের ছোটাছুটিতে বাড়ির আশপাশটাও যেন একটু বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। চড়ুই ছিল এমন এক পাখি, যাকে দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। ঘরের জানালা খুললেই দেখা মিলত। উঠানে পড়ে থাকা চালের দানা, ভাতের কণা কিংবা আশপাশের ছোট পোকামাকড় খুঁজে খেত তারা। মানুষের এত কাছাকাছি থেকেও তাদের নিয়ে কারো বিশেষ ভাবনা ছিল না—কারণ চড়ুই তখন ছিল আমাদের চারপাশেরই স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু সেই দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

 

 

চড়ুই কমে যাওয়ার পেছনে একটি নয়, বরং একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো বাসস্থান সংকুচিত হয়ে যাওয়া। আধুনিক ভবনে পুরোনো দিনের মতো দেয়ালের ফাঁক, কার্নিশ বা ছাদের নিরাপদ কোণ কম থাকায় চড়ুইয়ের বাসা বাঁধার সুযোগও কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্যের সংকট। শহরে গাছপালা ও সবুজ জায়গা কমে গেলে পোকামাকড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎসও কমে যেতে পারে। কৃষি ও বাগানে কীটনাশকের ব্যবহারও পাখির খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে। দূষণ ও নগরায়ণও পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে। অতিরিক্ত শব্দ, বায়ুদূষণ, যানবাহনের চাপ এবং ক্রমাগত নির্মাণকাজ শহরের পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়, শহরের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপরও পড়ে।

আরও পড়ুনঃ  গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো ইচ্ছা নেই: তথ্যমন্ত্রী

 

 

চড়ুই কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই অনেক সময় মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণের কথা বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা দাবিও দেখা যায়। তবে চড়ুই কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে মোবাইল টাওয়ারকে দায়ী করার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং গবেষণা ও পরিবেশবিদদের আলোচনায় বাসস্থান হারানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, নগরায়ণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের মতো একাধিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। একটি ছোট পাখির সংখ্যা কমে যাওয়াকে হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি নির্দিষ্ট পরিবেশব্যবস্থার অংশ। পাখি, পোকামাকড়, গাছপালা—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক।

আরও পড়ুনঃ  গণভোটের গণরায় পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়: ১১ দলীয় ঐক্য

 

চড়ুইয়ের মতো শহরঘেঁষা পাখির উপস্থিতি তাই শুধু সৌন্দর্য বা শৈশবের স্মৃতির বিষয় নয়; এটি একটি শহরের জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। কোনো এলাকায় পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণীর জন্য উপযোগী পরিবেশ কমে গেলে সেটি সেই এলাকার সামগ্রিক পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিতও হতে পারে। চড়ুইয়ের জন্য কিছু করতে খুব বড় আয়োজনের দরকার নেই। বাড়ির বারান্দা, ছাদ বা জানালার পাশে পরিষ্কার পানির পাত্র রাখা যেতে পারে। নিরাপদ জায়গায় কিছু দানা রাখা যায়। সুযোগ থাকলে ছোট পাখির জন্য বাসা বানানোর বাক্সও রাখা যেতে পারে। তবে পানি ও খাবারের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে পাখি সহজে আসতে পারে এবং শিকারি প্রাণীর ঝুঁকি কম থাকে।

আরও পড়ুনঃ  কোথায় গেল পদ্মার সেই রুপালি ইলিশ

 

সবুজ জায়গা বাড়ানো, গাছ লাগানো এবং বাড়ির আশপাশে পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। শহর বদলাবে, নতুন ভবন উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বদলের মধ্যে চড়ুইয়ের জন্য কি একটু জায়গা রাখা যায় না? আজও হয়তো কোনো এক সকালে আপনার জানালার কার্নিশে এসে বসবে একটি চড়ুই। কয়েক মুহূর্তের জন্য শোনা যাবে সেই পরিচিত কিচিরমিচির। হয়তো সেটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে—শহর যতই বদলাক, প্রকৃতির জন্য একটু জায়গা রাখলে তারাও ফিরে আসতে পারে। নইলে এমন একদিনও আসতে পারে, যখন চড়ুইয়ের কিচিরমিচির আর সকালের পরিচিত শব্দ থাকবে না। থাকবে শুধু পুরোনো দিনের গল্প—‘একসময় আমাদের জানালার পাশেও চড়ুই আসত।

 

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

কোথায় চড়ুইয়ের সেই কিচিরমিচির

আপডেটের সময়: ০৬:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সকাল হলেই একসময় শোনা যেত চড়ুইয়ের কিচিরমিচির। জানালার কার্নিশ, বারান্দার রেলিং কিংবা ছাদের কোণে দল বেঁধে বসত ছোট্ট পাখিগুলো। কেউ খাবার খুঁজত, কেউ বাসার জন্য খড়কুটো জড়ো করত। তাদের ছোটাছুটিতে বাড়ির আশপাশটাও যেন একটু বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। চড়ুই ছিল এমন এক পাখি, যাকে দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। ঘরের জানালা খুললেই দেখা মিলত। উঠানে পড়ে থাকা চালের দানা, ভাতের কণা কিংবা আশপাশের ছোট পোকামাকড় খুঁজে খেত তারা। মানুষের এত কাছাকাছি থেকেও তাদের নিয়ে কারো বিশেষ ভাবনা ছিল না—কারণ চড়ুই তখন ছিল আমাদের চারপাশেরই স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু সেই দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।

 

 

চড়ুই কমে যাওয়ার পেছনে একটি নয়, বরং একাধিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো বাসস্থান সংকুচিত হয়ে যাওয়া। আধুনিক ভবনে পুরোনো দিনের মতো দেয়ালের ফাঁক, কার্নিশ বা ছাদের নিরাপদ কোণ কম থাকায় চড়ুইয়ের বাসা বাঁধার সুযোগও কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্যের সংকট। শহরে গাছপালা ও সবুজ জায়গা কমে গেলে পোকামাকড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎসও কমে যেতে পারে। কৃষি ও বাগানে কীটনাশকের ব্যবহারও পাখির খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে। দূষণ ও নগরায়ণও পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে। অতিরিক্ত শব্দ, বায়ুদূষণ, যানবাহনের চাপ এবং ক্রমাগত নির্মাণকাজ শহরের পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়, শহরের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপরও পড়ে।

আরও পড়ুনঃ  মেধা ও যোগ্যতার যেকোনো অর্জনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

 

 

চড়ুই কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই অনেক সময় মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণের কথা বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা দাবিও দেখা যায়। তবে চড়ুই কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে মোবাইল টাওয়ারকে দায়ী করার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং গবেষণা ও পরিবেশবিদদের আলোচনায় বাসস্থান হারানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, নগরায়ণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের মতো একাধিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। একটি ছোট পাখির সংখ্যা কমে যাওয়াকে হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি নির্দিষ্ট পরিবেশব্যবস্থার অংশ। পাখি, পোকামাকড়, গাছপালা—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক।

আরও পড়ুনঃ  কোথায় গেল পদ্মার সেই রুপালি ইলিশ

 

চড়ুইয়ের মতো শহরঘেঁষা পাখির উপস্থিতি তাই শুধু সৌন্দর্য বা শৈশবের স্মৃতির বিষয় নয়; এটি একটি শহরের জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। কোনো এলাকায় পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণীর জন্য উপযোগী পরিবেশ কমে গেলে সেটি সেই এলাকার সামগ্রিক পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিতও হতে পারে। চড়ুইয়ের জন্য কিছু করতে খুব বড় আয়োজনের দরকার নেই। বাড়ির বারান্দা, ছাদ বা জানালার পাশে পরিষ্কার পানির পাত্র রাখা যেতে পারে। নিরাপদ জায়গায় কিছু দানা রাখা যায়। সুযোগ থাকলে ছোট পাখির জন্য বাসা বানানোর বাক্সও রাখা যেতে পারে। তবে পানি ও খাবারের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে পাখি সহজে আসতে পারে এবং শিকারি প্রাণীর ঝুঁকি কম থাকে।

আরও পড়ুনঃ  একনেকে অনুমোদন পেল ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটির ১২ প্রকল্প

 

সবুজ জায়গা বাড়ানো, গাছ লাগানো এবং বাড়ির আশপাশে পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। শহর বদলাবে, নতুন ভবন উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বদলের মধ্যে চড়ুইয়ের জন্য কি একটু জায়গা রাখা যায় না? আজও হয়তো কোনো এক সকালে আপনার জানালার কার্নিশে এসে বসবে একটি চড়ুই। কয়েক মুহূর্তের জন্য শোনা যাবে সেই পরিচিত কিচিরমিচির। হয়তো সেটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে—শহর যতই বদলাক, প্রকৃতির জন্য একটু জায়গা রাখলে তারাও ফিরে আসতে পারে। নইলে এমন একদিনও আসতে পারে, যখন চড়ুইয়ের কিচিরমিচির আর সকালের পরিচিত শব্দ থাকবে না। থাকবে শুধু পুরোনো দিনের গল্প—‘একসময় আমাদের জানালার পাশেও চড়ুই আসত।