
আক্তার হোসেন প্রতিনিধি কুলাউড়া উপজেলা: হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ)। ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার তপ্ত বালুচরে রচিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও একই সাথে সবচেয়ে গৌরবময় এক অধ্যায়। অন্যায়, স্বৈরাচার এবং অধর্মের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ‘শহীদে কারবালা’। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে। ইয়াজিদের শাসনব্যবস্থা ছিল ইসলামি শরিয়ত, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। সে জোরপূর্বক জনগণের আনুগত্য (বাইয়াত) আদায় করতে শুরু করে। ইসলামের আদর্শকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং খেলাফতের নামে রাজতন্ত্র ও স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ইমাম হোসেন (রা.) ইয়াজিদের আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কুফাবাসীদের বারবার আমন্ত্রণে এবং ইসলামকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার মহান দায়িত্বে তিনি মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে এবং পরবর্তীতে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
কুফায় পৌঁছানোর আগেই কারবালার মরুপ্রান্তরে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী (হুর ও ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে) ইমাম হোসেন (রা.)-এর কাফেলাকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ফোরাত নদীর তীরবর্তী এই প্রান্তরেই শুরু হয় মানবতার ইতিহাসের এক চরম নির্মমতা। ৭ই মহররম থেকে ফোরাত নদীর পানি ইমাম হোসেন (রা.)-এর শিবিরের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ কাফেলার সদস্যরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। একদিকে ইয়াজিদের হাজার হাজার সশস্ত্র সৈন্য, অন্যদিকে মাত্র ৭২ জন সঙ্গী নিয়ে ইমাম হোসেন (রা.)-এর সত্যের কাফেলা। এই অসম সমীকরণেও ইমামের কাফেলা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ১০ই মহররম (আশুরা) সকালে যু’দ্ধ শুরু হয়। একে একে ইমাম হোসেন (রা.)-এর ভাই, পুত্র, ভাতিজা এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীরা বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম হোসেনের যুবরাজ আলী আকবর বীরত্বের সাথে লড়ে শহীদ হন। এমনকি তাঁর মাত্র ৬ মাসের তৃষ্ণার্ত শিশু আলী আজগরকেও ইয়াজিদ বাহিনীর তীরন্দাজরা নির্মমভাবে হ/ত্যা করে। সবশেষে অবশিষ্ট বীর ইমাম হোসেন (রা.) নিজে ময়দানে নামেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হওয়া সত্ত্বেও তিনি সিংহের মতো লড়াই করেন। জোহরের সালাত আদায়ের সময় বা সালাত পরবর্তী মুহূর্তে শিমার ইবনে জিলজুশানের নির্দেশে সিনান ইবনে আনাস ইমাম হোসেন (রা.)-এর পবিত্র ম’স্ত’ক মোবারক দে’হ থেকে বি’চ্ছি’ন্ন করে।
কারবালার যু’দ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই ছিল না। এটি ছিল মূলত হক (সত্য) ও বাতিলের (মিথ্যা) চিরন্তন দ্বন্দ্ব। ইমাম হোসেন (রা.) চাইলে ইয়াজিদের সাথে আপস করে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের ও পরিবারের জীবন বিসর্জন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, সাময়িকভাবে অন্যায় শক্তিশালী মনে হলেও চূড়ান্ত বিজয় সর্বদা সত্য ও ন্যায়েরই হয়। কারবালার মূল শিক্ষা হলো—যেকোনো পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং জীবনের বিনিময়ে হলেও আদর্শকে ধরে রাখা। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও কারবালার চেতনা আজও বিশ্ববাসীকে অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা জোগায়। শহীদে কারবালার এই র’ক্ত’ক্ষ’য়ী ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—শির দেওয়া সম্ভব, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা কখনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
প্রতিবেদকের নাম 
























