
সি এইচ মাহবুব,বরিশালঃ নদ-নদীতে কমছে জাতীয় মাছ ইলিশ আহরণ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত চার বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৭৪৬ টন। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাস ইলিশের ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও জেলেরা প্রত্যাশিত মাছের দেখা পাচ্ছেন না। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরেই নদীভিত্তিক এই উৎপাদন হ্রাসের ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই সংকট নিরসন এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইলিশ কমার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায় চার মাসব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালনা করছে মৎস্য অধিদপ্তর। গত শনিবার দ্বীপ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলায় এই মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। চার মাসব্যাপী এই অনুসন্ধানী কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট মৎস্যবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথম দফায় টানা নয় দিন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যকেন্দ্র পরিদর্শন করবে গবেষণাদলটি। তারা ভোলার মনপুরা ও চরফ্যাশন, বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া, মহিপুর ও আলীপুর এলাকায় সরাসরি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন।
পরিদর্শনকালে গবেষক দলটি সরেজমিনে দেখা যায় আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন মৎস্যঘাট ও বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলছেন। ইলিশের বিচরণ ও সংকট সম্পর্কিত তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও মতামত নথিভুক্ত করা হবে। মাঠপর্যায়ের এই তথ্য ও পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেই পরবর্তীতে নদ-নদীতে ইলিশের উৎপাদন পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
দক্ষিণাঞ্চলে সমীক্ষা করার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের এই দলে রয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ আতিকুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কীভাবে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ করা যায় এবং উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা খুঁজতে এই সমীক্ষা করা হবে। এ সময় নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র পরিদর্শন করা হবে। একইসঙ্গে মৎস্য আহরণ এবং জেলেদের জীবনমানের উন্নয়নে করণীয় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। এজন্য সমীক্ষা দল দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা, জেলে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলবে। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন ইলিশ আহরণের পর থেকেই এই ধস শুরু হয়। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় তিন লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে হয় তিন লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা দুই লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে নেমে আসে।
হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরের ব্যবধানে বিভাগটিতে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৭৪৬ টন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও ইলিশ আহরণের এই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। মৌসুমে বরিশাল পোর্ট রোড মোকামে দৈনিক যেখানে হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হতো, সেখানে গত শুক্রবার সরবরাহ ছিল মাত্র ৬০ মণ। ইলিশ আহরণের একই অবস্থা বিভাগের সব জেলাতেই। পোর্ট রোড মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, বর্ষা হলো, তবু নদীতে ইলিশ মিলছে না। অথচ কয়েক বছর আগেও এই সময়ে দৈনিক হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ থাকত এই মোকামে। ইলিশের অভাবে মাছ ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। শুক্রবার প্রতি কেজি বড় ইলিশ বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৭৫০ টাকা দরে। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে মাছ আহরণও বাড়ার কথা, কিন্তু মেঘনা, কালাবদর, ইলিশা, কীর্তনখোলায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশের এই সংকট কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেই পথ খুঁজতে একটি সমীক্ষা দল কাজ করবে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 



















