Dhaka ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
কাদের মির্জা ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের তিন মামলা রাজশাহী মহানগরীর শান্তি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে: মাহফুজুর রহমান রিটন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ওয়াশিং ফ্যাক্টরির মেশিনে কাটা পড়ে শিশু শ্রমিকের মৃত্যু অভিযান আর জরিমানায় থামছে না মিঠাপুকুরের ভেজাল গুড়ের দৌরাত্ম্য লালপুরে দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত এক বছরে ১২ লক্ষাধিক টাকার বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান, ঈদগাঁও মডেল হাসপাতাল হাত পায়ের রগ অবশ,চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না ক্ষেতলালের কাউছারের পরিবার পত্নীতলায় আদিবাসীদের বর্ণাঢ্য কারাম উৎসব পালিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় মোবাইল কোর্ট, ৭ জনের কারাদণ্ড দ্রুত বিচার দ্রুত রায়-শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘ অপেক্ষা

দ্রুত বিচার দ্রুত রায়-শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘ অপেক্ষা

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৫:০৮:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩৮ সময় দেখুন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মামলায় দ্রুত রায় হলেও ভুক্তভোগীর পরিবারের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। বিচারিক আদালতে দণ্ড ঘোষণার পরও উচ্চ আদালতের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকছে চূড়ান্ত শাস্তি ঢাকার পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়, মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও সেখানেই শেষ হচ্ছে না বিচারপ্রক্রিয়া। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স, আপিলসহ উচ্চ আদালতের একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। ফলে দ্রুত বিচার ও রায়ের পরও চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা থেকে যাচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, বিচারিক আদালতে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও উচ্চ আদালতে মামলাজট, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এবং পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়ার কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সব মামলায় নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

 

১৯ দিনে রায়, বাস্তবায়ন হয়নি এখনো
রাজধানীর পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গত ১৯ মে ২০২৬ রামিসাকে তাদের ভাড়া বাসায় হত্যা করা হয়। ২৪ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একই দিন মামলাটি বিচারের জন্য শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। এরপর বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে মাত্র পাঁচটি শুনানিতে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। গত ৭ জুন রায় ঘোষণা করেন আদালত। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলাটিতে একদিনেই রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রামিসার বাবা-মা ও বড় বোন, কয়েকজন প্রতিবেশী, চিকিৎসক, ঢাকা মহানগর হাকিম ও তদন্ত কর্মকর্তা। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে দ্রুত রায়ের দিকে যায় মামলাটি। তবে বিচারিক আদালতের রায়ের পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ তৈরি হয়নি।

আরও পড়ুনঃ  সারাদেশে মামলাজটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনের কার্যক্রম

 

মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতের অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পাঠানো বাধ্যতামূলক। রামিসা মামলার ৬৯ পৃষ্ঠার রায়সহ ডেথ রেফারেন্স ও অন্যান্য নথি ৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর ১৪ জুন সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুন পৃথক আপিল করেন। হাইকোর্ট তাদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন এবং ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে আপিলের শুনানি করার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে মাত্র পাঁচটি শুনানিতে রায় হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মামলাটিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, “বিচারিক আদালতে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও উচ্চ আদালতে মামলাজট, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এবং পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়ার কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সব মামলায় নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।”

 

বিচারিক আদালতের রায়ই পুরো প্রক্রিয়ার শেষ নয়:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান বলেন, বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচার শেষ হওয়া মানেই মামলার পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তিনি বলেন, “কোনো হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেটি হাইকোর্টে ডেথ কনফার্মেশন হিসেবে আসে। সেখানে শুনানি শেষ হওয়ার পরও আপিলের সুযোগ থাকে। হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগসহ আরো আইনগত ধাপ রয়েছে। এসব ধাপ শেষ করে মামলার চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামানের ভাষ্য, মামলাজট রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে বিচার ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। আলোচিত মামলায় জনমত ও গণমাধ্যমের নজর থাকায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও একই ধরনের অন্য মামলাগুলোতে একই গতি নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রামিসার পরিবার যেমন স্বজন হারানোর কষ্ট পেয়েছে, গণমাধ্যমে না আসা অন্য হত্যাকাণ্ডের ভুক্তভোগী পরিবারও একই কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়। কোনো মামলা গণমাধ্যমে আলোচিত বলেই সেটির বিচার দ্রুত হবে, অন্য মামলাগুলো পিছিয়ে থাকবে—এটি কাম্য নয়। তার মতে, “দ্রুত বিচার ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত আলোচিত-অনালোচিত সব মামলায় সমানভাবে নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করা।”

আরও পড়ুনঃ  খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রীপ্রতি বাস ভাড়া ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মালিকদের

 

আছিয়া মামলাতেও দ্রুত বিচার, পরে দীর্ঘ অপেক্ষা
মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাতেও দ্রুত বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। ৮ মার্চ শিশুটির মা মামলা করেন। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্য তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। ২১ মে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছে। তবে হাইকোর্টে মামলাটির শুনানি শুরু হয় ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট। ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৪ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও উচ্চ আদালতের পর্যায়ে যেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি শুরু হওয়ায় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোয়।

 

 

 

অপ্রতিম হত্যার বিচারের অপেক্ষা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডও শিশু হত্যার বিচার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার এবং পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও কিছু আলামত উদ্ধার এবং ফরেনসিক অ্যানালাইসিস চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, “রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো কুমিল্লার এই হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত শেষ হবে।

আরও পড়ুনঃ  ১০ কোটি টাকার সেতুতে বাঁশ: টাঙ্গাইলে সেই সেতু পরিদর্শনে দুদক

 

 

আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে শাস্তি কার্যকর সম্ভব নয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর বলেন, আইনের নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চাইলেই কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, দ্রুত শাস্তি কার্যকরের ইচ্ছা থাকলেও আগে আইনের সবগুলো ধারা প্রয়োগ করতে হবে। এরপরই শাস্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সরকারকে আরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। রায় কার্যকর বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। এগুলোর পেছনে বিদেশি কিংবা বড় কোনো শক্তি কাজ করবে বলে তারা বিশ্বাস করেন না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধের ঘটনা ঘটে। অপরাধ ঘটবেই, তবে তা যেন সহনীয় মাত্রায় থাকে।

 

 

আইনের নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চাইলেই কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।”-অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর রায় কার্যকরের আইনি বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, “আপিল বিভাগের রায়ের পর রাষ্ট্রপতির কাছে মার্সি পিটিশনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিতে পারেন, আবার সাজা বহালও রাখতে পারেন। সাজা বহাল থাকলে জেল কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে চিঠি পাওয়ার পর যেকোনো সময় ফাঁসির রায় কার্যকর করতে পারে। তার ভাষ্য, “এ কারণে আসামি রায় কার্যকর হওয়ার আগে কিছু সময় পায়। কখনো তা মাসাধিকাল বা আরো দীর্ঘ হতে পারে। এটিও রায় কার্যকরে বিলম্ব হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। তবে এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

কাদের মির্জা ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের তিন মামলা

দ্রুত বিচার দ্রুত রায়-শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘ অপেক্ষা

আপডেটের সময়: ০৫:০৮:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মামলায় দ্রুত রায় হলেও ভুক্তভোগীর পরিবারের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। বিচারিক আদালতে দণ্ড ঘোষণার পরও উচ্চ আদালতের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকছে চূড়ান্ত শাস্তি ঢাকার পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তার হত্যা মামলায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়, মাগুরার শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও সেখানেই শেষ হচ্ছে না বিচারপ্রক্রিয়া। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ডেথ রেফারেন্স, আপিলসহ উচ্চ আদালতের একাধিক ধাপ পেরোতে হয়। ফলে দ্রুত বিচার ও রায়ের পরও চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা থেকে যাচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, বিচারিক আদালতে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও উচ্চ আদালতে মামলাজট, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এবং পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়ার কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সব মামলায় নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

 

১৯ দিনে রায়, বাস্তবায়ন হয়নি এখনো
রাজধানীর পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। গত ১৯ মে ২০২৬ রামিসাকে তাদের ভাড়া বাসায় হত্যা করা হয়। ২৪ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একই দিন মামলাটি বিচারের জন্য শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। এরপর বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে মাত্র পাঁচটি শুনানিতে বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। গত ৭ জুন রায় ঘোষণা করেন আদালত। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলাটিতে একদিনেই রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন রামিসার বাবা-মা ও বড় বোন, কয়েকজন প্রতিবেশী, চিকিৎসক, ঢাকা মহানগর হাকিম ও তদন্ত কর্মকর্তা। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে দ্রুত রায়ের দিকে যায় মামলাটি। তবে বিচারিক আদালতের রায়ের পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ তৈরি হয়নি।

আরও পড়ুনঃ  সংসদে ফাইল ছোড়া বা অসভ্য আচরণ করবে না জামায়াত: ডা. শফিকুর রহমান

 

মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতের অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পাঠানো বাধ্যতামূলক। রামিসা মামলার ৬৯ পৃষ্ঠার রায়সহ ডেথ রেফারেন্স ও অন্যান্য নথি ৯ জুন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর ১৪ জুন সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুন পৃথক আপিল করেন। হাইকোর্ট তাদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন এবং ডেথ রেফারেন্সের সঙ্গে আপিলের শুনানি করার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে মাত্র পাঁচটি শুনানিতে রায় হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মামলাটিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, “বিচারিক আদালতে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও উচ্চ আদালতে মামলাজট, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এবং পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়ার কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সব মামলায় নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করার সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।”

 

বিচারিক আদালতের রায়ই পুরো প্রক্রিয়ার শেষ নয়:
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান বলেন, বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচার শেষ হওয়া মানেই মামলার পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তিনি বলেন, “কোনো হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেটি হাইকোর্টে ডেথ কনফার্মেশন হিসেবে আসে। সেখানে শুনানি শেষ হওয়ার পরও আপিলের সুযোগ থাকে। হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগসহ আরো আইনগত ধাপ রয়েছে। এসব ধাপ শেষ করে মামলার চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামানের ভাষ্য, মামলাজট রায় কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে বিচার ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। আলোচিত মামলায় জনমত ও গণমাধ্যমের নজর থাকায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও একই ধরনের অন্য মামলাগুলোতে একই গতি নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রামিসার পরিবার যেমন স্বজন হারানোর কষ্ট পেয়েছে, গণমাধ্যমে না আসা অন্য হত্যাকাণ্ডের ভুক্তভোগী পরিবারও একই কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়। কোনো মামলা গণমাধ্যমে আলোচিত বলেই সেটির বিচার দ্রুত হবে, অন্য মামলাগুলো পিছিয়ে থাকবে—এটি কাম্য নয়। তার মতে, “দ্রুত বিচার ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত আলোচিত-অনালোচিত সব মামলায় সমানভাবে নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করা।”

আরও পড়ুনঃ  সারাদেশে মামলাজটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা প্রশাসনের কার্যক্রম

 

আছিয়া মামলাতেও দ্রুত বিচার, পরে দীর্ঘ অপেক্ষা
মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাতেও দ্রুত বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়। ৮ মার্চ শিশুটির মা মামলা করেন। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্য তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। ২১ মে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছে। তবে হাইকোর্টে মামলাটির শুনানি শুরু হয় ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট। ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ১৪ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও উচ্চ আদালতের পর্যায়ে যেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি শুরু হওয়ায় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোয়।

 

 

 

অপ্রতিম হত্যার বিচারের অপেক্ষা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডও শিশু হত্যার বিচার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার এবং পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও কিছু আলামত উদ্ধার এবং ফরেনসিক অ্যানালাইসিস চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, “রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো কুমিল্লার এই হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত শেষ হবে।

আরও পড়ুনঃ  কোথায় চড়ুইয়ের সেই কিচিরমিচির

 

 

আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে শাস্তি কার্যকর সম্ভব নয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর বলেন, আইনের নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চাইলেই কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, দ্রুত শাস্তি কার্যকরের ইচ্ছা থাকলেও আগে আইনের সবগুলো ধারা প্রয়োগ করতে হবে। এরপরই শাস্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সরকারকে আরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। রায় কার্যকর বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কোনো অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। এগুলোর পেছনে বিদেশি কিংবা বড় কোনো শক্তি কাজ করবে বলে তারা বিশ্বাস করেন না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধের ঘটনা ঘটে। অপরাধ ঘটবেই, তবে তা যেন সহনীয় মাত্রায় থাকে।

 

 

আইনের নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চাইলেই কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।”-অধ্যাপক আহমদ ইহসানুল কবীর রায় কার্যকরের আইনি বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, “আপিল বিভাগের রায়ের পর রাষ্ট্রপতির কাছে মার্সি পিটিশনের জন্য পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিতে পারেন, আবার সাজা বহালও রাখতে পারেন। সাজা বহাল থাকলে জেল কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে চিঠি পাওয়ার পর যেকোনো সময় ফাঁসির রায় কার্যকর করতে পারে। তার ভাষ্য, “এ কারণে আসামি রায় কার্যকর হওয়ার আগে কিছু সময় পায়। কখনো তা মাসাধিকাল বা আরো দীর্ঘ হতে পারে। এটিও রায় কার্যকরে বিলম্ব হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। তবে এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।