
তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল, উপকূলীয় জোয়ার এবং দীর্ঘদিনের ছড়া-খাল দখল ও অপরিকল্পিত জলপ্রবাহের কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, পুকুর ও গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপকূলীয় খানখানাবাদ এলাকায় বেড়িবাঁধের একাংশ ধসে পড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতে বাড়ছে পাহাড়ধসের শঙ্কা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, চাম্বল, শীলকূপ, সরল, গন্ডামারা, কাথারিয়া, বাহারছড়া, পুকুরিয়া, খানখানাবাদ এবং পৌরসভার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল। বৈলছড়ি ইউনিয়নের একাধিক এলাকাও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে আউশ ধানের বীজতলা, মৌসুমি সবজির ক্ষেত এবং বিভিন্ন ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষীরাও। নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে শেখেরখীল ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলে। নাপোড়া শেখেরখীল এলাকায় সড়ক ভেঙে যাওয়ায় বন্যার পানি হিন্দুপাড়াসহ আশপাশের গ্রামে ঢুকে কয়েকশ বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। সরকার বাজারের উত্তর পাশের নোয়াপাড়া, মোহাব্বত আলী পাড়া, কাচারীপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ছনুয়া ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চলে প্রায় এক হাজার পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্লুইসগেটে মাছ ধরার জাল বসিয়ে রাখায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
পুঁইছড়ি ইউনিয়নের হারুনের দোকানসংলগ্ন ব্রিক সলিং সড়ক ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রত্নপুর দিঘিরপাড়ায় সাতটি পরিবারের একমাত্র চলাচলের সড়ক কাদা ও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে টানা বর্ষণে সাঙ্গু নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গন্ডামারা, সরল, ছনুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা দুই দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ, মোবাইল চার্জিং, ইন্টারনেট ব্যবহার এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অন্ধকারে দুর্ভোগ বেড়েছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের। ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎহীনতার ত্রিমুখী সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বাঁশখালীর জনজীবন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দখলমুক্ত করে ছড়া-খাল সচল করা, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়ক সংস্কার এবং পানিবন্দি মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে আবহাওয়া এখনও বিরূপ রয়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা ও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি নামার অপেক্ষার পাশাপাশি নতুন করে পাহাড়ধস, নদীভাঙন ও আরও বড় ধরনের দুর্যোগের শঙ্কায় দিন কাটছে বাঁশখালীর হাজারো মানুষের।
প্রতিবেদকের নাম 


















