Dhaka ০৭:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
ভেদরগঞ্জে সরকারি দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা নিত্যবাজারে অস্থিরতা: বেড়েছে সবজি, মাছ ও মুরগির দাম পদযাত্রায় বাধা হামলা এনসিপির সংকট না সম্ভাবনা সংস্কারের বিপক্ষে দাঁড়ালে বিএনপির পতন হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতির প্রতিবাদে চট্টগ্রামে এনসিপির জনসভা মান্দায় প্রমিলা প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গে সাশ্রয়ী বাহনের নতুন ঠিকানা আটোয়ারীতে জমজমাট মোটরসাইকেলের হাট জুলাই সবার, কারও একার নয়: ডা. শফিকুর রহমান রাজধানীতে অভিযানে ৪৬৪ ধারালো অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

পদযাত্রায় বাধা হামলা এনসিপির সংকট না সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাধা, হামলা, পাল্টা কর্মসূচি ও উত্তেজনার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান। এনসিপির অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছেন এবং হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপি এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার জন্য এনসিপি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ শিরোনামে জেলায় জেলায় পদযাত্রা করছে এনসিপি। গত ৬ জুলাই বিকেলে গাজীপুরের কালীগঞ্জে পদযাত্রার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। পদযাত্রা করতে গিয়ে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রথম হবিগঞ্জে বড় হামলা–বাধার মুখে পড়ে এনসিপি। এর আগে ২৭ জুলাই এনসিপির পদযাত্রার দিন মেহেরপুর শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তারে দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত কুশপুত্তলিকাসদৃশ বস্তু ঝুলতে দেখা যায়। মেহেরপুরের সমাবেশস্থলের কাছ থেকে একটি বোমাসদৃশ বস্তুও উদ্ধার করে পুলিশ। কর্মসূচি শুরুর দিন ৬ জুলাই রাতে ঢাকার সাভারে এনসিপির পদযাত্রা–পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

 

দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে ওই ককটেল হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে এনসিপি। এ ঘটনায় যুবলীগের দুই নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, এনসিপিকে মাঠে বাধা দেওয়া বা তাদের কর্মসূচি ঘিরে সংঘাত তৈরি হলে সেটি উল্টো দলটির রাজনৈতিক প্রচারের সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, নতুন দল হিসেবে এনসিপি যত বেশি বাধা ও প্রতিরোধের মুখে পড়বে, ততই তারা নিজেদের ‘নিপীড়িত’ বা ‘বঞ্চিত’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল হিসেবে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতে চাওয়া এনসিপির জন্য এ সব ঘটনা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সিলেটের কানাইঘাট ও ওসমানীনগর এবং ৩১ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে এনসিপি পদযাত্রা করছে। এরপর তারা ঢাকায় সমাবেশের মধ্যে দিয়ে কর্মসূচি শেষ করবে।

 

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার চৌমুহনী ও আশপাশের এলাকায় এনসিপি জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে ইট নিক্ষেপ ও কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। দলটির নেতাদের দাবি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। কানাইঘাট উপজেলায় পদযাত্রা ও সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত মাঠ না ছাড়ার অঙ্গীকার শপথ পাঠ করান দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি তিনি বলেন, ‘‘আমাদের যে ১৪০০ ভাইয়ের লাশ কবরে চলে গিয়েছে, শহীদ হয়েছে। আমরা বাংলাদেশে তাদের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়বো না।’’ তার কথা স্পষ্ট, তারা আরো লম্বা সময় বিভিন্ন দাবিতে মাঠে থাকতে চান। এই সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন দেশে ফিরে নতুন বাংলাদেশের যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুনঃ  হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রায় হামলা, আহত সারজিস-নাসীরুদ্দীন

বিএনপির বিরুদ্ধে এনসিপির রাজনৈতিক অভিযোগ
শুধু মাঠের কর্মসূচিতে বাধার অভিযোগ নয়, এনসিপির নেতারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসন বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। তার দাবি, এমন প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব নয় এবং নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, পুলিশ ও আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও দাবি করেছেন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিএনপির প্রতি এক ধরনের নমনীয়তা তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনও বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। তবে বিএনপি এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ‘পলিটিক্যাল রেটরিক’ বা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার পাল্টা অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদেরই সখ্যতা বেশি। রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, এনসিপির নেতারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। ফলে প্রশাসন বিএনপির হয়ে কাজ করছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানও নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই প্রশাসনকে বিএনপির প্রশাসন বলা ঠিক হবে না। বরং এমন বক্তব্য সরকারের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।

হবিগঞ্জে সবচেয়ে বড় সংঘাত
এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা ও সংঘাতের অভিযোগ এসেছে হবিগঞ্জ থেকে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সেখানে পদযাত্রা ও সমাবেশ শেষে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর সার্কিট হাউসের দিকে যাওয়ার সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগ উঠে। এনসিপির দাবি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে সারজিস আলমের গাড়িকেও ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতির কারণে সারজিস আলমের গাড়ি একটি ব্যাংক ভবনে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। এনসিপির অভিযোগ, এই হামলার সঙ্গে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন। তবে হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মো. জি কে গউছ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এনসিপির সঙ্গে বিএনপির কোনো বিরোধ নেই এবং তাদের ওপর হামলা করার কোনো কারণও নেই। কে বা কারা হামলা করেছে, তা তিনি জানেন না এবং বিএনপি এর সঙ্গে জড়িত নয়। হামলার প্রতিবাদেও বাধা হবিগঞ্জের ঘটনার প্রতিবাদে এনসিপি পর দিন বুধবার (২৯ জুলাই) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের দিকে রওনা হলে সাতগাঁও এলাকায় পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। পরে ব্যারিকেড ভেঙে তারা হবিগঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলেও বাহুবলের কামাইছড়া এলাকায় আবারও পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। সেখানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কে অবস্থান নেন। প্রায় চার ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার পর তারা এলাকা ত্যাগ করেন। এর আগে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগও দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এনসিপির পক্ষ থেকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। দলটির নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদেরই কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  তাহিরপুরে বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে তরুণীর অনশন, প্রেমিক পলাতক

সিলেটে বাড়তি নিরাপত্তা
এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় সিলেটের পাঁচ উপজেলায় প্রশাসন বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কানাইঘাট, ওসমানীনগর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মসূচি এবং সন্ধ্যার পর পদযাত্রা থাকায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সব জায়গায় সরাসরি বাধার অভিযোগ না থাকলেও এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, সিলেটের প্রস্তুতি তারই ইঙ্গিত দেয়। এনসিপির জুলাই পদযাত্রা শুরু হয়েছিল ৬ জুলাই গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে। দলটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভা ঘুরে কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। পদযাত্রার শুরুতেই ঢাকার সাভারে কর্মসূচি-পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এই ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে হামলা হয়েছে বলেও দলটি অভিযোগ করে। পরে এ ঘটনায় যুবলীগের দুই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। এরপর ২৭ জুলাই মেহেরপুরে এনসিপির পদযাত্রার দিন শহরের প্রধান সড়কের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তারে দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত কুশপুত্তলিকাসদৃশ বস্তু ঝুলতে দেখা যায়। সমাবেশস্থলের কাছ থেকে বোমাসদৃশ একটি বস্তু উদ্ধারের কথাও জানায় পুলিশ।

 

এরপর হবিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জের ঘটনা এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে ঘিরে উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। বাধা দিলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এনসিপি এখনো একটি নতুন দল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা এই দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। এই পরিস্থিতিতে কর্মসূচিতে বাধা বা হামলার ঘটনা এনসিপির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিটি বাধার পর দলটি সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বিএনপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিজেদেরকে ‘বাধার মুখে থাকা নতুন রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের ঘটনায় গাড়িবহর আটকে যাওয়া, নেতাদের অবস্থান নেওয়া, পুলিশি বাধা এবং আহত নেতা-কর্মীর বিষয়গুলো এনসিপির রাজনৈতিক প্রচারের বড় উপাদান হয়ে উঠেছে। এতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের নামও সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি পরিচিত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে পরপর দুবার এনসিপির শীর্ষ নেতাদের গাড়িবহরে হামলা

বাধা, সংঘাত ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরে এখন পর্যন্ত গাজীপুরের সাভার, মেহেরপুর, হবিগঞ্জ ও সিলেটের গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন ধরনের হামলা, উত্তেজনা, বাধা বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে হামলার অভিযোগ, পাল্টা কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা, পুলিশি বাধা এবং এনসিপির নেতাদের সড়কে অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিপি বলছে, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাধা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিএনপি বলছে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাঠের এই বাস্তবতায় আরেকটি দিকও রয়েছে। নতুন একটি দল হিসেবে এনসিপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা। সেই জায়গায় তাদের কর্মসূচিতে যত বেশি বাধা আসছে, ততই তারা জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসছে। বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংঘাতের ঘটনাগুলো এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগও দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এনসিপির পদযাত্রা ঠেকাতে গিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা কি উল্টো নতুন দলটিকে আরও বেশি পরিচিত ও আলোচিত করে তুলছেন? যে দলটি দেশের রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে মাঠে নেমেছে, তাদের কর্মসূচিতে বাধা ও সংঘাতে কি তারা সংকটে পড়ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার পথই সহজ করে দিচ্ছে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে এনসিপি এসব ঘটনাকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হয়, তার ওপর।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

ভেদরগঞ্জে সরকারি দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা

পদযাত্রায় বাধা হামলা এনসিপির সংকট না সম্ভাবনা

আপডেটের সময়: ০৬:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাধা, হামলা, পাল্টা কর্মসূচি ও উত্তেজনার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান। এনসিপির অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছেন এবং হামলা চালিয়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপি এ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার জন্য এনসিপি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ শিরোনামে জেলায় জেলায় পদযাত্রা করছে এনসিপি। গত ৬ জুলাই বিকেলে গাজীপুরের কালীগঞ্জে পদযাত্রার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। পদযাত্রা করতে গিয়ে গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রথম হবিগঞ্জে বড় হামলা–বাধার মুখে পড়ে এনসিপি। এর আগে ২৭ জুলাই এনসিপির পদযাত্রার দিন মেহেরপুর শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তারে দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত কুশপুত্তলিকাসদৃশ বস্তু ঝুলতে দেখা যায়। মেহেরপুরের সমাবেশস্থলের কাছ থেকে একটি বোমাসদৃশ বস্তুও উদ্ধার করে পুলিশ। কর্মসূচি শুরুর দিন ৬ জুলাই রাতে ঢাকার সাভারে এনসিপির পদযাত্রা–পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

 

দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে ওই ককটেল হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে এনসিপি। এ ঘটনায় যুবলীগের দুই নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, এনসিপিকে মাঠে বাধা দেওয়া বা তাদের কর্মসূচি ঘিরে সংঘাত তৈরি হলে সেটি উল্টো দলটির রাজনৈতিক প্রচারের সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, নতুন দল হিসেবে এনসিপি যত বেশি বাধা ও প্রতিরোধের মুখে পড়বে, ততই তারা নিজেদের ‘নিপীড়িত’ বা ‘বঞ্চিত’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল হিসেবে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতে চাওয়া এনসিপির জন্য এ সব ঘটনা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সিলেটের কানাইঘাট ও ওসমানীনগর এবং ৩১ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে এনসিপি পদযাত্রা করছে। এরপর তারা ঢাকায় সমাবেশের মধ্যে দিয়ে কর্মসূচি শেষ করবে।

 

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার চৌমুহনী ও আশপাশের এলাকায় এনসিপি জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে অংশ নিতে যাওয়া কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে ইট নিক্ষেপ ও কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। দলটির নেতাদের দাবি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। কানাইঘাট উপজেলায় পদযাত্রা ও সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত মাঠ না ছাড়ার অঙ্গীকার শপথ পাঠ করান দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি তিনি বলেন, ‘‘আমাদের যে ১৪০০ ভাইয়ের লাশ কবরে চলে গিয়েছে, শহীদ হয়েছে। আমরা বাংলাদেশে তাদের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়বো না।’’ তার কথা স্পষ্ট, তারা আরো লম্বা সময় বিভিন্ন দাবিতে মাঠে থাকতে চান। এই সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন দেশে ফিরে নতুন বাংলাদেশের যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে পরপর দুবার এনসিপির শীর্ষ নেতাদের গাড়িবহরে হামলা

বিএনপির বিরুদ্ধে এনসিপির রাজনৈতিক অভিযোগ
শুধু মাঠের কর্মসূচিতে বাধার অভিযোগ নয়, এনসিপির নেতারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসন বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। তার দাবি, এমন প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব নয় এবং নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, পুলিশ ও আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও দাবি করেছেন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিএনপির প্রতি এক ধরনের নমনীয়তা তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনও বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। তবে বিএনপি এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ‘পলিটিক্যাল রেটরিক’ বা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার পাল্টা অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদেরই সখ্যতা বেশি। রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, এনসিপির নেতারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। ফলে প্রশাসন বিএনপির হয়ে কাজ করছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানও নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই প্রশাসনকে বিএনপির প্রশাসন বলা ঠিক হবে না। বরং এমন বক্তব্য সরকারের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।

হবিগঞ্জে সবচেয়ে বড় সংঘাত
এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা ও সংঘাতের অভিযোগ এসেছে হবিগঞ্জ থেকে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সেখানে পদযাত্রা ও সমাবেশ শেষে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর সার্কিট হাউসের দিকে যাওয়ার সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগ উঠে। এনসিপির দাবি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। পরে সারজিস আলমের গাড়িকেও ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতির কারণে সারজিস আলমের গাড়ি একটি ব্যাংক ভবনে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। এনসিপির অভিযোগ, এই হামলার সঙ্গে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন। তবে হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মো. জি কে গউছ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এনসিপির সঙ্গে বিএনপির কোনো বিরোধ নেই এবং তাদের ওপর হামলা করার কোনো কারণও নেই। কে বা কারা হামলা করেছে, তা তিনি জানেন না এবং বিএনপি এর সঙ্গে জড়িত নয়। হামলার প্রতিবাদেও বাধা হবিগঞ্জের ঘটনার প্রতিবাদে এনসিপি পর দিন বুধবার (২৯ জুলাই) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের দিকে রওনা হলে সাতগাঁও এলাকায় পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। পরে ব্যারিকেড ভেঙে তারা হবিগঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলেও বাহুবলের কামাইছড়া এলাকায় আবারও পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। সেখানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কে অবস্থান নেন। প্রায় চার ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার পর তারা এলাকা ত্যাগ করেন। এর আগে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগও দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এনসিপির পক্ষ থেকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। দলটির নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদেরই কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  আপা যেখানেই নামবে সেখানেই ফাঁসি বাস্তবায়ন করবে জনতা: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

সিলেটে বাড়তি নিরাপত্তা
এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় সিলেটের পাঁচ উপজেলায় প্রশাসন বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কানাইঘাট, ওসমানীনগর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মসূচি এবং সন্ধ্যার পর পদযাত্রা থাকায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সব জায়গায় সরাসরি বাধার অভিযোগ না থাকলেও এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, সিলেটের প্রস্তুতি তারই ইঙ্গিত দেয়। এনসিপির জুলাই পদযাত্রা শুরু হয়েছিল ৬ জুলাই গাজীপুরের কালীগঞ্জ থেকে। দলটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভা ঘুরে কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। পদযাত্রার শুরুতেই ঢাকার সাভারে কর্মসূচি-পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এই ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে হামলা হয়েছে বলেও দলটি অভিযোগ করে। পরে এ ঘটনায় যুবলীগের দুই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। এরপর ২৭ জুলাই মেহেরপুরে এনসিপির পদযাত্রার দিন শহরের প্রধান সড়কের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তারে দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত কুশপুত্তলিকাসদৃশ বস্তু ঝুলতে দেখা যায়। সমাবেশস্থলের কাছ থেকে বোমাসদৃশ একটি বস্তু উদ্ধারের কথাও জানায় পুলিশ।

 

এরপর হবিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জের ঘটনা এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে ঘিরে উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। বাধা দিলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এনসিপি এখনো একটি নতুন দল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা এই দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। এই পরিস্থিতিতে কর্মসূচিতে বাধা বা হামলার ঘটনা এনসিপির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিটি বাধার পর দলটি সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বিএনপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিজেদেরকে ‘বাধার মুখে থাকা নতুন রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের ঘটনায় গাড়িবহর আটকে যাওয়া, নেতাদের অবস্থান নেওয়া, পুলিশি বাধা এবং আহত নেতা-কর্মীর বিষয়গুলো এনসিপির রাজনৈতিক প্রচারের বড় উপাদান হয়ে উঠেছে। এতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের নামও সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি পরিচিত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  তাহিরপুরে বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে তরুণীর অনশন, প্রেমিক পলাতক

বাধা, সংঘাত ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরে এখন পর্যন্ত গাজীপুরের সাভার, মেহেরপুর, হবিগঞ্জ ও সিলেটের গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন ধরনের হামলা, উত্তেজনা, বাধা বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে হামলার অভিযোগ, পাল্টা কর্মসূচি, ১৪৪ ধারা, পুলিশি বাধা এবং এনসিপির নেতাদের সড়কে অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিপি বলছে, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাধা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিএনপি বলছে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাঠের এই বাস্তবতায় আরেকটি দিকও রয়েছে। নতুন একটি দল হিসেবে এনসিপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা। সেই জায়গায় তাদের কর্মসূচিতে যত বেশি বাধা আসছে, ততই তারা জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসছে। বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংঘাতের ঘটনাগুলো এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগও দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এনসিপির পদযাত্রা ঠেকাতে গিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা কি উল্টো নতুন দলটিকে আরও বেশি পরিচিত ও আলোচিত করে তুলছেন? যে দলটি দেশের রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে মাঠে নেমেছে, তাদের কর্মসূচিতে বাধা ও সংঘাতে কি তারা সংকটে পড়ছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার পথই সহজ করে দিচ্ছে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে এনসিপি এসব ঘটনাকে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হয়, তার ওপর।