
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গণপরিবহনে প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারী যাত্রীরা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের তরফে আলাদা বাসসেবা চালুসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। সীমিতসংখ্যক বাস, নারীচালকের অভাব, তদারকির ঘাটতি ও তথ্যের অপ্রতুলতায় নারীর জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। তবে চলতি বছরের ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীতে নারীর জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলামকে নির্দেশ দেন। এরপর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) আলাদা বাস সার্ভিস সম্প্রসারণ এবং নারী চালক ও সহকারী নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিআরটিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে এসব বাসে নারী সহকারী থাকলেও নারী চালকের সংকট রয়েছে। নারীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সালে বিআরটিসির উদ্যোগে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে আলাদা বাস সার্ভিস চালু হয়। পরে ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় তা সম্প্রসারণ করা হয়।
২০০৯ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আবারও এই সেবা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৫ সালে এর আওতায় ১২টি বাস চালু ছিল। বর্তমানে ৯টি রুটে মাত্র ৯টি বাস চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এসব বাস কোন রুটে, কখন চলাচল করে—এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানেন না বেশির ভাগ নারী যাত্রী। বিআরটিসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) শুকদেব ঢালী জানান, বনশ্রী-মতিঝিল, মিরপুর-১ থেকে কল্যাণপুর হয়ে মতিঝিল, মিরপুর-১২ থেকে ১০ নম্বর হয়ে মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, ডেমরা-মতিঝিল, রূপনগর থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল, তালতলা থেকে কলাবাগান হয়ে মতিঝিল এবং গাবতলী-কল্যাণপুর থেকে মতিঝিল রুটে সকালে ও বিকেলে অফিস সময়ে এসব বাস চলাচল করে।
পদে পদে হয়রানি, রুট বাড়ানোর দাবি
পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর নানা উদ্যোগ থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রভাব নেই বলে অভিযোগ। নারী যাত্রীরা বলছেন, গণপরিবহনে তাঁরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাঁদের দাবি, রাজধানীর প্রতিটি রুটে নারীবান্ধব বাস সার্ভিস চালু করতে হবে। আলাদা পরিবহনব্যবস্থা থাকলে যৌন হয়রানির ঝুঁকি কমবে এবং নিরাপদে চলাচল সম্ভব হবে। নিয়মিত গণপরিবহনে যাতায়াত করেন নারী উদ্যোক্তা সাবরিনা চৌধুরী। তিনি বলেন মোহাম্মদপুরের বছিলা থেকে প্রতিদিন শাহবাগে যেতে হয়। কিন্তু নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন প্রায়ই পুরুষ যাত্রীরা দখল করে রাখেন। বাসে উঠলেই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। একই অভিযোগ কলেজছাত্রী অর্পিতা অমি ও বৃষ্টি বিশ্বাসের। তাঁদের ভাষ্য—কলেজে যাওয়ার পথে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে কথা বলে জানতে পেরেছেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা প্রায় সবার।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো খারাপ
যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সেভ দ্য রোড’ ২০২৪ সালে দাবি করে, গণপরিবহনে ৮২ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে নিগৃহীত হন। গত দুই বছরে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির মহাসচিব শান্তা ফারজানা। তিনি বলেন, নারীর জন্য নিরাপদ গণপরিবহনের দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। বিআরটিএর ম্যাজিস্ট্রিয়াল টিম থাকলেও তা সক্রিয় নয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শান্তা ফারজানা মনে করেন, সাধারণ বাসে নারীর বসার জন্য ২০ শতাংশ আসন বরাদ্দ হলে সমস্যা অনেকটা দূর হবে।
নেই নারীচালক, বাড়তি সার্ভিসের বাস নিয়েও সংকট
বিআরটিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে ৯টি রুটে মাত্র ৯টি বাস চলছে।এসব বাসে নারী সহকারী থাকলেও নারী চালক না থাকায় পুরুষেরাই চালাচ্ছেন। সম্প্রতি কিছু নারীকে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে বিআরটিসি। সংস্থার চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ‘বিআরটিসিতে বর্তমানে নারী ড্রাইভার নেই, তবে হেল্পার আছেন। নারী চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যে আমরা নারীদের বাস সার্ভিসে নারী চালক নিয়োগ করতে যাচ্ছি। বাস সংকটের কারণে নারীর জন্যে বাস পরিষেবা বাড়ানো এখনই সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি। আব্দুল লতিফ মোল্লার দাবি, অফিস সময়ে বাস পাওয়া যায়, তবে অনেকের জানা নেই বলে তারা এই সার্ভিসের সুবিধা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, কোরিয়া থেকে ৩৪০টি বাস আসার কথা রয়েছে। সেগুলো এলে নারীর জন্য প্রত্যেক রুটে বাস সার্ভিস চালু করা সম্ভব হবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীতে যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক সামছুল হক জানান, তারেক রহমান গণপরিবহন খাত সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহী। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানকালে সেখানকার গণপরিবহন ব্যবস্থা কাছ থেকে দেখেছেন এবং বাংলাদেশে জনগণবান্ধব একটি কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি তাকে ভাবাচ্ছে।
অনিয়মে বন্ধ বাসের সিসিটিভি
বাসে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর তখনকার মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা নারী বাসে সিসিটিভি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। দিপ্ত ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পে গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে ঢাকায় চলাচল করা পরিস্থান পরিবহন, রাজধানী সুপার সার্ভিস, প্রজাপতি পরিবহন, বসুমতী পরিবহন ও গাবতলী এক্সপ্রেসের ১০০টি বাসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। তবে উদ্বোধনের এক বছরের মধ্যেই সমন্বয়হীনতা ও তদারকির অভাবে সব বাস থেকে চুরি কিংবা নষ্ট হয়ে যায় সিসিটিভি ক্যামেরা। বর্তমানের নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) কাজী গোলাম তৌসিফ বলেন, এ প্রকল্পের বিষয়ে গত বছর রিভিউ মিটিং হয়েছিল। তারা (প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা) এ বিষয়ে বিআরটিসির সঙ্গে সমন্বয় করছেন। নারীর জন্য গণপরিবহনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে এখনো নারীদের গণপরিবহন নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। আমাদের প্রস্তবের মধ্যে হয়ত থাকবে, তবে মন্ত্রী মহোদয়ের অনুমতির পরে চূড়ান্ত হবে।
প্রতিবেদকের নাম 






















