
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একসময় ভোরের নীরবতা ভাঙত জাতীয় পাখি দোয়েলের মিষ্টি শিষ। গ্রামবাংলার আকাশ-বাতাস মুখর হতো দোয়েলের চিরায়ত সুমধুর শিষে। বাড়ির আঙিনা, গাছের ডাল কিংবা খড়ের চাল, সবখানেই ছিল ছোট্ট এই পাখির রাজত্ব। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, নির্বিচারে কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের এই নীরব সংকেত জীববৈচিত্র্য ও কৃষি, উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ভোরে মসজিদে বাচ্চাদের আরবি পড়তে যাওয়া, কৃষকের ক্ষেতে যাওয়ার সময় প্রতিটি এলাকায় সহজেই দেখা মিলত দোয়েলের। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি হিসেবে পরিচিত ছোট্ট এই পাখিটি ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত দৃশ্য হটাৎ অপরিচিত হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দোয়েল। দোয়েলের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার। দোয়েলের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড়। কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে এসব পোকা বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। সেই বিষাক্ত পোকা খেয়ে দোয়েলও নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা তাদের বেঁচে থাকা ও প্রজননের ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ ছাড়া দ্রুত নগরায়ন, নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও দোয়েলের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। একসময় গাছের কোটর, পুরোনো ঘরের চাল কিংবা ঝোপঝাড়ে সহজেই বাসা বাঁধতে পারলেও এখন এসব নিরাপদ আশ্রয় দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে তাদের প্রজননও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দোয়েল শুধু বাংলাদেশের জাতীয় পাখিই নয়, এটি প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষায় কৃষকের নীরব সহকারী হিসেবে কাজ করে এই পাখি। পাশাপাশি প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষাতেও দোয়েলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দোয়েলকে রক্ষা করতে হলে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে, গাছপালা সংরক্ষণ করতে হবে এবং পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও পাখি ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। দোয়েলের মিষ্টি শিষ শুধু একটি পাখির ডাক নয়, এটি আমাদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যেরও এক মূল্যবান অংশ। তাই দোয়েলকে রক্ষা করা মানে শুধু জাতীয় পাখিকে বাঁচানো নয়; বরং আমাদের পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
প্রতিবেদকের নাম 























