Dhaka ১১:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে, কাঁদছে নবাবগঞ্জ ১০৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট সহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা ডিবি দক্ষিণ পুলিশ ভেদরগঞ্জে সচেতন মা, আপনি সেরা মা—শ্রেষ্ঠ অভিভাবক পুরস্কার ২০২৬ ধামইরহাটে মিথ্যা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত আল-কুরআনবিরোধী সংবিধানই সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল সমস্যা: ইসলামী সমাজ লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা অনুষ্ঠিত ভয়ে থমকে আছে গাজীপুরে বন উদ্ধার পত্নীতলায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে পুলিশ পলাশবাড়ীতে পুকুরে বিষ প্রয়োগে ৩ লক্ষ টাকার মাছ নিধনের অভিযোগ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে

পাহাড়ে লেগেছে সোনালি রঙ

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৫:৫৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২০ সময় দেখুন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বান্দরবানে পাহাড়ে উৎপাদিত জুমের পাকা ধানে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। গ্রামীণ সড়কের দুপাশে এবং দূরের সবুজ পাহাড়গুলোর ঢালে ঢালে শোভা পাচ্ছে জুমের পাকা ধানের সোনালি রঙ, দূর থেকে মনে হচ্ছে পাহাড়ে লেগেছে সোনালি রঙ। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও পাহাড়ে চাষ করা জুমের পাকা ধান ঘরে তুলতে কাটা শুরু করেছেন জুমিয়ারা। কোথাও জুমে উৎপাদিত সাথি ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পাহাড়িরা। কৃষি বিভাগ ও জুমিয়াদের তথ্যমতে, বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলায় প্রতি বছরই জুম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। গত বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম চাষ হয়েছিল ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর। ফসল উৎপাদন হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টনের বেশি। এ বছর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর পাহাড়ি ঢালুতে। জুমে উৎপাদনের ফসলের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এদিকে জুমের ভালো ফলনে জুমিয়া পরিবারদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়, সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে শোভা পাচ্ছে জুমের পাকা ধানের সোনালি রঙ। এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ধান বপনে খুব বেশি সময়ের ব্যবধান হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় জুমের ফলনও তুলনামূলক ভালো হয়েছে।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় জুমের ধানও একই সময়ে পাকে না। যারা বৈশাখ মাসের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর ধান বপন করতে পেরেছেন, তাদের জুমের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে। জুমের ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও জুমচাষিরা ধান কাটতে শুরু করেছেন, আবার কোথাও ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাকা ধান ও ফসল পাহারা দিতে অনেক জুমচাষি সপরিবারে জুমঘরে অবস্থান করছেন। কেউ ধান কাটার আগেই মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসল সংগ্রহ করছেন। কেউবা পাকা ধান কাটার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়।সরেজমিনে দেখা যায় রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের যামিনীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, জুমের পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষিরা। ছোটবড় কেউই ঘরে বসে নেই। জুমের ফসল গড়ে তোলতে সপরিবারে উঠেছেন জুম খেতের পাহাড়ে যামিনীপাড়ার বাসিন্দা রিং লট ম্রো সপরিবারে এবং শ্রমের বিনিময়ে কাজ করা আট নারী শ্রমিককে নিয়ে জুমের পাকা ধান কাটার কাজ করছেন।

আরও পড়ুনঃ  আটোয়ারীতে অনুমোদনহীন তোয়াউমুন বেকারি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে শিশু খাদ্য

 

জুমচাষি ইয়াংরি ম্রো বলেন, এ বছর প্রায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে তিন ‘আড়ি’ বীজের ধান রোপণ করে জুম চাষ করেছেন। এক আড়ি সমান প্রায় ১০ কেজি ধান। এবারের জুমের ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ভালো ফলনের আশাবাদী। তিন একর জুম থেকে এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়া যাবে আশা জুমচাষির। আরও ভালো হলে আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত ধান পাওয়া সম্ভব। স্থানীয় জুমচাষি রিং লট ম্রো বলেন, পুলিশে চাকরি করার পর চলতি বছরের জুন মাসে অবসর নিয়েছেন রিং লট ম্রো। অবসরের পর বসে না থেকে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে ফিরেছেন। ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি) কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো, প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়। নারী শ্রমিক সংডং ম্রো বলেন, জুম না করলে আমরা কী খাব? জুম করতেই হবে। প্রতি বছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।

আরও পড়ুনঃ  আমরা ফটোসেশনের রাজনীতি করি না: পানিসম্পদমন্ত্রী

তিনি জানান, জুমে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ, ঢেঁড়সসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল উৎপাদন করা হয়। এসব সাথি ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে কিছু অর্থও আয় করেন জুমচাষিরা। জুমিয়াদের দাবি, জুম চাষ মূলত প্রকৃতি ও মৌসুমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি দীর্ঘ কৃষি প্রক্রিয়া। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বছরের জুম চাষের জায়গা নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত পাহাড়ি এলাকায় জঙ্গল কাটা শুরু হয়। কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পর মার্চ-এপ্রিল মাসে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুন দিয়ে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এরপর পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে জুমের জায়গা পরিষ্কার করে ধান ও সাথি ফসল বপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন জুমচাষিরা। বৈশাখের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হলে জুমে ধানসহ বিভিন্ন সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়। যারা প্রথম বৃষ্টির পর দ্রুত বীজ বপন করতে পারেন, তাদের জুমের ধান আগে পাকে। আর যারা কিছুটা দেরিতে বপন করেন, তাদের ধানও দেরিতে কাটার উপযোগী হয়। সাধারণত আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। ধান শুকানোর পর জুমঘর থেকে মূলঘরে ধান স্থানান্তর করা হয়।

আরও পড়ুনঃ  রাজশাহী-দুর্গাপুর যোগাযোগের একমাত্র সড়কে খানাখন্দ হাঁটুঞ্জলে চরম দুর্ভোগ

এরপর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাহাড়ি জনপদে ঘরে ঘরে চলে জুমের ধানের নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের ভাত ও নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এই উৎসব। পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন তাই চলছে ধান কাটার উৎসব। সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠছে জুমঘর। বছরের দীর্ঘ শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে ব্যস্ত পাহাড়ের মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা জুমচাষিদের কাছে এই ধান শুধু খাদ্য নয়—এটি তাদের জীবন, জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের অংশ। বিষয়টি নিশ্চিত করে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, এবার জেলায় প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে। এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়। রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে জুমের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে। জুম চাষে উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনে জুমচাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে, কাঁদছে নবাবগঞ্জ

পাহাড়ে লেগেছে সোনালি রঙ

আপডেটের সময়: ০৫:৫৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বান্দরবানে পাহাড়ে উৎপাদিত জুমের পাকা ধানে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। গ্রামীণ সড়কের দুপাশে এবং দূরের সবুজ পাহাড়গুলোর ঢালে ঢালে শোভা পাচ্ছে জুমের পাকা ধানের সোনালি রঙ, দূর থেকে মনে হচ্ছে পাহাড়ে লেগেছে সোনালি রঙ। ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও পাহাড়ে চাষ করা জুমের পাকা ধান ঘরে তুলতে কাটা শুরু করেছেন জুমিয়ারা। কোথাও জুমে উৎপাদিত সাথি ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পাহাড়িরা। কৃষি বিভাগ ও জুমিয়াদের তথ্যমতে, বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলায় প্রতি বছরই জুম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। গত বছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম চাষ হয়েছিল ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর। ফসল উৎপাদন হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার ৪৯৯ মেট্রিক টনের বেশি। এ বছর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর পাহাড়ি ঢালুতে। জুমে উৎপাদনের ফসলের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এদিকে জুমের ভালো ফলনে জুমিয়া পরিবারদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায়, সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে শোভা পাচ্ছে জুমের পাকা ধানের সোনালি রঙ। এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ধান বপনে খুব বেশি সময়ের ব্যবধান হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় জুমের ফলনও তুলনামূলক ভালো হয়েছে।

তবে পাহাড়ি অঞ্চলে সব জায়গায় বৃষ্টিপাত সমান না হওয়ায় জুমের ধানও একই সময়ে পাকে না। যারা বৈশাখ মাসের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর ধান বপন করতে পেরেছেন, তাদের জুমের ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে। জুমের ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও জুমচাষিরা ধান কাটতে শুরু করেছেন, আবার কোথাও ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাকা ধান ও ফসল পাহারা দিতে অনেক জুমচাষি সপরিবারে জুমঘরে অবস্থান করছেন। কেউ ধান কাটার আগেই মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসল সংগ্রহ করছেন। কেউবা পাকা ধান কাটার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়।সরেজমিনে দেখা যায় রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের যামিনীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, জুমের পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষিরা। ছোটবড় কেউই ঘরে বসে নেই। জুমের ফসল গড়ে তোলতে সপরিবারে উঠেছেন জুম খেতের পাহাড়ে যামিনীপাড়ার বাসিন্দা রিং লট ম্রো সপরিবারে এবং শ্রমের বিনিময়ে কাজ করা আট নারী শ্রমিককে নিয়ে জুমের পাকা ধান কাটার কাজ করছেন।

আরও পড়ুনঃ  আটোয়ারীতে অনুমোদনহীন তোয়াউমুন বেকারি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে শিশু খাদ্য

 

জুমচাষি ইয়াংরি ম্রো বলেন, এ বছর প্রায় তিন একর পাহাড়ি জমিতে তিন ‘আড়ি’ বীজের ধান রোপণ করে জুম চাষ করেছেন। এক আড়ি সমান প্রায় ১০ কেজি ধান। এবারের জুমের ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ভালো ফলনের আশাবাদী। তিন একর জুম থেকে এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়া যাবে আশা জুমচাষির। আরও ভালো হলে আড়াইশ আড়ি পর্যন্ত ধান পাওয়া সম্ভব। স্থানীয় জুমচাষি রিং লট ম্রো বলেন, পুলিশে চাকরি করার পর চলতি বছরের জুন মাসে অবসর নিয়েছেন রিং লট ম্রো। অবসরের পর বসে না থেকে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষে ফিরেছেন। ‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি) কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো, প্রয়োজনীয় অনেক সবজি এখান থেকেই পাওয়া যায়। নারী শ্রমিক সংডং ম্রো বলেন, জুম না করলে আমরা কী খাব? জুম করতেই হবে। প্রতি বছর আমরা জুম চাষ করি। এটা আমাদের ঐতিহ্য।

আরও পড়ুনঃ  আমরা ফটোসেশনের রাজনীতি করি না: পানিসম্পদমন্ত্রী

তিনি জানান, জুমে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, মারফা, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ, ঢেঁড়সসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল উৎপাদন করা হয়। এসব সাথি ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে কিছু অর্থও আয় করেন জুমচাষিরা। জুমিয়াদের দাবি, জুম চাষ মূলত প্রকৃতি ও মৌসুমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি দীর্ঘ কৃষি প্রক্রিয়া। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী বছরের জুম চাষের জায়গা নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত পাহাড়ি এলাকায় জঙ্গল কাটা শুরু হয়। কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পর মার্চ-এপ্রিল মাসে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে আগুন দিয়ে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এরপর পুরো এপ্রিল মাসজুড়ে জুমের জায়গা পরিষ্কার করে ধান ও সাথি ফসল বপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন জুমচাষিরা। বৈশাখের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি হলে জুমে ধানসহ বিভিন্ন সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়। যারা প্রথম বৃষ্টির পর দ্রুত বীজ বপন করতে পারেন, তাদের জুমের ধান আগে পাকে। আর যারা কিছুটা দেরিতে বপন করেন, তাদের ধানও দেরিতে কাটার উপযোগী হয়। সাধারণত আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। ধান শুকানোর পর জুমঘর থেকে মূলঘরে ধান স্থানান্তর করা হয়।

আরও পড়ুনঃ  বগুড়ায় তন্ময় ফুড প্রোডাক্টসকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

এরপর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাহাড়ি জনপদে ঘরে ঘরে চলে জুমের ধানের নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের ভাত ও নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এই উৎসব। পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন তাই চলছে ধান কাটার উৎসব। সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠছে জুমঘর। বছরের দীর্ঘ শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আনন্দে ব্যস্ত পাহাড়ের মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা জুমচাষিদের কাছে এই ধান শুধু খাদ্য নয়—এটি তাদের জীবন, জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের অংশ। বিষয়টি নিশ্চিত করে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, এবার জেলায় প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে। এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়। রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকায় ইতোমধ্যে জুমের পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে। জুম চাষে উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনে জুমচাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।