
কায়সার আশ্রাফীঃ চট্টগ্রাম মহানগর প্রতিনিধি
নগরীর ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোর অন্যতম আসকার দিঘি দিন দিন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল, দূষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিঘিটির প্রায় পুরো অংশ কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় ভরে গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ময়লা–আবর্জনা ও বর্জ্যের স্তূপ জমে পানির স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এক সময়ের স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত জলাশয়টি এখন অনেকটাই মৃতপ্রায় রূপ ধারণ করেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক এই জলাধার ভবিষ্যতে তার পরিবেশগত ও জলাধারগত গুরুত্ব হারাতে পারে।
নগরীর জামালখান এলাকায় অবস্থিত আসকার দিঘি কয়েকশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী একটি জলাশয়। নগরীর জলাধার ব্যবস্থায় এই দিঘির গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিঘি নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
একসময় এই দিঘির স্বচ্ছ পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর বিচরণ ছিল। আশপাশের বাসিন্দাদের জন্যও এটি ছিল একটি প্রাকৃতিক উন্মুক্ত পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবহেলার কারণে দিঘিটির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিঘিটি ঘন কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় আচ্ছাদিত। কোথাও কচুরিপানার ফাঁকে দেখা গেল কালো ময়লা পানি। প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল এবং বিভিন্ন বর্জ্য জমে কচুরিপানার নিচে চাপা পড়া পানির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং বিভিন্ন ড্রেনের ময়লা পানি দিঘিতে পড়ার কারণে কচুরিপানা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
স্থানীয়দের মতে, আসকার দিঘির চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোগত চাপ বাড়ছে। কোথাও কোথাও তীরবর্তী অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জলাশয়ের স্বাভাবিক সীমানা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় দখলের ঝুঁকিও বাড়ছে।
কচুরিপানা ও আগাছা পানির উপরিভাগ ঢেকে ফেললে পানিতে দ্রবীভূত অঙিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি জমে থাকা জৈব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং মশা–মাছির প্রজননও বৃদ্ধি পায়। আসকার দিঘি এখন শহরের একটি বড় ধরনের মশক প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, নগরের জলাশয়গুলো শহরের সৌন্দর্যের জন্য রক্ষা করা জরুরি। এছাড়া জলবায়ু সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় জলাধার হারিয়ে গেলে তার প্রভাব স্থানীয় তাপমাত্রা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ে বলে পরিবেশবিদেরা মন্তব্য করেছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, আসকার দিঘিকে রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কচুরিপানা ও ভাসমান বর্জ্য অপসারণ, নিয়মিত ড্রেজিং, পানি দূষণের উৎস চিহ্নিত করে বন্ধ করা এবং জলাধারের সীমানা সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে না পারলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেছেন, আসকার দিঘিকে শুধুমাত্র একটি দিঘি হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। তাই এই দিঘিকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে পুনরুজ্জীবিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় নগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলাধার অচিরেই তার অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
প্রতিবেদকের নাম 



















