Dhaka ০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
কুড়িগ্রামে ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা ও ভ্যাকসিন কার্যক্রম সাঘাটায় বজ্রপাতে মা-ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু, ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে দিশেহারা পুত্রবধূ বগুড়া শহর বাইপাস করে নতুন রেলপথের উদ্যোগ কেন্দুয়ায় ৫শ টাকা পাওনার বিরোধে একজনকে কুপিয়ে হত্যা! মা-ছেলে আটক পবায় গ্রাম আদালতের সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বার্ষিক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত মাদারগঞ্জে নিজ ঘরে বিষাক্ত সাপের কামড়ে, ছোট্ট শিশুর মৃত্যু ধমকিয়ে-পিটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না: মির্জা ফখরুল নেপালকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার ফাইনালে বাংলাদেশ বিদ্যুতের দাম বাড়লো ফ্ল্যাটে মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু ছেলে সেই যুগ্মসচিবকে প্রত্যাহার

স্বর্ণের কলসির ফাঁদে নিঃস্ব অনেক পরিবার, প্রাণ গেল গৃহবধূর

এম. ওমর হাসনাত, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও। জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর বেশিরভাগ মানুষেই অশিক্ষিত, গরিব ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সেই সূযোগকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে জেলার বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর, রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলায় স্বর্ণের কলসি ও গুপ্তধনের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। চক্রের সদস্যরা কখনো ‘জ্বিনের বাদশা’ কখনো তান্ত্রিক বা কখনো ভিক্ষুকের ছদ্মবেশ ধারণ করে এবং অলৌকিক ক্ষমতার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

সাম্প্রতিক ঘটনা ও প্রতারণার ধরন:
১লা জুন সোমবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে নাসিমা আকতার (৩৫) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেন পুলিশ। নিহত নাসিমা আকতার রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর গ্রামের ইউপি সদস্য মো.আব্দুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী। উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হরিপুর উপজেলার টেংরিয়া মকবুলপাড়া গ্রামের তথাকথিত তান্ত্রিক মো. সামশুল হক (৫৫) কে গ্রেপ্তার করেন পুলিশ।

আরও পড়ুনঃ  বসতবাড়ির পাশে পোল্ট্রি ফার্ম: দুর্গন্ধে বন্ধের উপক্রম মসজিদের নামাজ

মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন – “অভিযুক্ত সামশুল হক তার দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। নিহত নাসিমার সাথে অভিযুক্ত তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ সামশুল হকের প্রায় এক বছর ধরে পরিচয় ছিল। সোনার কলসি ও কিছু গুপ্তধন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সামশুল হক নিহত নাসিমার কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে, নিহত নাসিমা সোনার কলসি আর গুপ্রধন নেওয়ার জন্য সামশুল হকের কাছে যাওয়া আসা করেন। সামশুল হক তাকে সোনার কলসি না দিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা অলৌকিক আশ্বাস দিয়ে ঘুরাতে থাকেন। এরপরে গত ৩০ মে মধ্য রাতে নিহত নাসিমা তথাকথিত তান্ত্রিক সামশুল হকের কাছে সোনার কলসি আনতে যান এবং সামশুল হককে ত্রিশ হাজার টাকা প্রদান করেন। এক পর্যায়ে নাসিমা জেদ করে বসে আর সামশুল হককে বলেন- আমি আজকে সোনার কলসি বাসায় নিয়ে যাবো, না হলে আমি আজ বাসায় ফিরব না।” কোনো উপায় না পেয়ে তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ সামশুল হক সোনার কলসি দেওয়ার কথা বলে নিহত নাসিমাকে একটা নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে নিহত নাসিমার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সামশুল হক। এরপরে আলামত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে দিয়াশলাই ম্যাচের জলন্ত কাঠি মরদেহের উপর ফেলে দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন তথাকথিত কবিরাজ সামশুল হক।

আরও পড়ুনঃ  বগুড়ার সোনাতলায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অপহরণ, থানায় মামলা

আরো কিছু পৃথক ঘটনা:
সপ্তাহখানেক আগে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কালমেঘ লালাপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামকে স্বর্ণের কলসি ও গুপ্তধন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় তিন লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন জিনের বাদশা নামক আরেকটি চক্র।
তার একদিন আগে রাণীশংকৈল উপজেলার আরেকটি পরিবারের কাছ থেকে উক্ত প্রতারক চক্র পাঁচ লক্ষ টাকা একই কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছেন। জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারটি সুদের ভিত্তিতে পাঁচ লক্ষ টাকা ধার নিয়ে প্রতারক চক্রকে দিয়েছিল অতি দ্রুত ধনী হওয়ার আশায়। এখন সুদের টাকার চাপে ভুক্তভোগী পরিবারটি দিশেহারা ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

জ্বিনের বাদশা বা তান্ত্রিকের ফাঁদ: এ চক্রের প্রতারকরা কৌশলে মানুষের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দিয়ে জানায়, তাদের কাছে স্বর্ণের কলসি ও বিপুল পরিমাণ গুপ্তধন রয়েছে যা উদ্ধারে ‘যোগ্য মানুষ’ খুঁজছে তারা। কোটিপতি হওয়ার আশায় সরল বিশ্বাসে অনেক পরিবার প্রতারকদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দেয়। এছাড়া নকল সোনার পুতুল বা মুদ্রা দেখিয়েও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  দুর্গম পাহাড়ে হামের হানা: বিলাইছড়িতে মহামারী শঙ্কা, আক্রান্তদের রুমা ও বান্দরবানে জরুরি স্থানান্তর

ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন উপজেলার নাম না জানা আরো কিছু গরিব পরিবার জিনের বাদশা নামক এই প্রতারক চক্রের কাছে লক্ষ লক্ষ টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। জেলার পুলিশ থানাগুলোতে এই জিনের বাদশা নামক প্রতারক চক্রের বিপক্ষে দুই ডজনের মতো মামলা রয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রতারক চক্রের বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
এদিকে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ এই তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ ও জিনের বাদশা নামক প্রতারক চক্র থেকে সাধারণ মানুষকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এসব প্রতারক চক্রকে ধরার জন্য সহযোগিতা করতে বলেছেন।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

কুড়িগ্রামে ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা ও ভ্যাকসিন কার্যক্রম

স্বর্ণের কলসির ফাঁদে নিঃস্ব অনেক পরিবার, প্রাণ গেল গৃহবধূর

আপডেটের সময়: ১০:৫২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

এম. ওমর হাসনাত, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও। জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর বেশিরভাগ মানুষেই অশিক্ষিত, গরিব ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সেই সূযোগকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে জেলার বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর, রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলায় স্বর্ণের কলসি ও গুপ্তধনের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। চক্রের সদস্যরা কখনো ‘জ্বিনের বাদশা’ কখনো তান্ত্রিক বা কখনো ভিক্ষুকের ছদ্মবেশ ধারণ করে এবং অলৌকিক ক্ষমতার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

সাম্প্রতিক ঘটনা ও প্রতারণার ধরন:
১লা জুন সোমবার সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ভবানীপুর এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে নাসিমা আকতার (৩৫) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেন পুলিশ। নিহত নাসিমা আকতার রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর গ্রামের ইউপি সদস্য মো.আব্দুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী। উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হরিপুর উপজেলার টেংরিয়া মকবুলপাড়া গ্রামের তথাকথিত তান্ত্রিক মো. সামশুল হক (৫৫) কে গ্রেপ্তার করেন পুলিশ।

আরও পড়ুনঃ  কক্সবাজারে শহীদ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালিত

মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন – “অভিযুক্ত সামশুল হক তার দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। নিহত নাসিমার সাথে অভিযুক্ত তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ সামশুল হকের প্রায় এক বছর ধরে পরিচয় ছিল। সোনার কলসি ও কিছু গুপ্তধন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সামশুল হক নিহত নাসিমার কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে, নিহত নাসিমা সোনার কলসি আর গুপ্রধন নেওয়ার জন্য সামশুল হকের কাছে যাওয়া আসা করেন। সামশুল হক তাকে সোনার কলসি না দিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা অলৌকিক আশ্বাস দিয়ে ঘুরাতে থাকেন। এরপরে গত ৩০ মে মধ্য রাতে নিহত নাসিমা তথাকথিত তান্ত্রিক সামশুল হকের কাছে সোনার কলসি আনতে যান এবং সামশুল হককে ত্রিশ হাজার টাকা প্রদান করেন। এক পর্যায়ে নাসিমা জেদ করে বসে আর সামশুল হককে বলেন- আমি আজকে সোনার কলসি বাসায় নিয়ে যাবো, না হলে আমি আজ বাসায় ফিরব না।” কোনো উপায় না পেয়ে তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ সামশুল হক সোনার কলসি দেওয়ার কথা বলে নিহত নাসিমাকে একটা নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে নিহত নাসিমার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সামশুল হক। এরপরে আলামত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে দিয়াশলাই ম্যাচের জলন্ত কাঠি মরদেহের উপর ফেলে দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন তথাকথিত কবিরাজ সামশুল হক।

আরও পড়ুনঃ  জনশক্তি রপ্তানি কমেছে চট্টগ্রাম থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরবে গতি

আরো কিছু পৃথক ঘটনা:
সপ্তাহখানেক আগে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কালমেঘ লালাপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামকে স্বর্ণের কলসি ও গুপ্তধন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় তিন লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন জিনের বাদশা নামক আরেকটি চক্র।
তার একদিন আগে রাণীশংকৈল উপজেলার আরেকটি পরিবারের কাছ থেকে উক্ত প্রতারক চক্র পাঁচ লক্ষ টাকা একই কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছেন। জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারটি সুদের ভিত্তিতে পাঁচ লক্ষ টাকা ধার নিয়ে প্রতারক চক্রকে দিয়েছিল অতি দ্রুত ধনী হওয়ার আশায়। এখন সুদের টাকার চাপে ভুক্তভোগী পরিবারটি দিশেহারা ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

জ্বিনের বাদশা বা তান্ত্রিকের ফাঁদ: এ চক্রের প্রতারকরা কৌশলে মানুষের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দিয়ে জানায়, তাদের কাছে স্বর্ণের কলসি ও বিপুল পরিমাণ গুপ্তধন রয়েছে যা উদ্ধারে ‘যোগ্য মানুষ’ খুঁজছে তারা। কোটিপতি হওয়ার আশায় সরল বিশ্বাসে অনেক পরিবার প্রতারকদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দেয়। এছাড়া নকল সোনার পুতুল বা মুদ্রা দেখিয়েও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  বগুড়ার সোনাতলায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অপহরণ, থানায় মামলা

ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন উপজেলার নাম না জানা আরো কিছু গরিব পরিবার জিনের বাদশা নামক এই প্রতারক চক্রের কাছে লক্ষ লক্ষ টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। জেলার পুলিশ থানাগুলোতে এই জিনের বাদশা নামক প্রতারক চক্রের বিপক্ষে দুই ডজনের মতো মামলা রয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রতারক চক্রের বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।
এদিকে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ এই তথাকথিত তান্ত্রিক কবিরাজ ও জিনের বাদশা নামক প্রতারক চক্র থেকে সাধারণ মানুষকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এসব প্রতারক চক্রকে ধরার জন্য সহযোগিতা করতে বলেছেন।