Dhaka ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
সিলেটে শিরিন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ৪র্থ মেধাবৃত্তি পরীক্ষা সম্পন্ন বর্ণাঢ্য আয়োজনে চার্টার সনদ লাভ করলো এপেক্স ক্লাব অফ মাতামুহুরি বগুড়ার সোনাতলায় পুলিশের ওপর হামলা, আসামি ছিনতাই। দুই পুলিশ সদস্যকে মারধর, পিকআপ ভাঙচুর; আটক চার নারী ধুনটে মনন সাহিত্য সংগঠনের ১২২তম পাক্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্যের চিত্রকর্মে সাজছে ওভারপাসের দেয়াল, পরিদর্শনে এমপি বাদশা টেকনাফে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের মৃত্যুতে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের গভীর শোক কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীতে জামায়াতের কর্মী সমাবেশ জেলা আমীর নুর আহমদ আনোয়ারী মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ: পাকা ধানের শীষে কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক সিরাজদিখানের বালুচর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, পুড়ে ছাই ৩টি দোকান ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিডি ক্লিন টিমের পরিচ্ছন্নতা অভিযান

বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ: আকাশছোঁয়া নির্মাণ ব্যয়, ব্যাহত উন্নয়ন ও তীব্র কর্মসংস্থান সংকট

মোঃরাসেল বিশেষ প্রতিনিধি: পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য জেলা বান্দরবানে স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদন বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলাটিতে কোনো ইটভাটা সচল না থাকায় সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই এখন তীব্র নির্মাণসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সম্পূর্ণভাবে পার্শ্ববর্তী জেলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় ইটের দাম ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যার ফলে থমকে গেছে গ্রামীণ অবকাঠামো ও আবাসন খাতের উন্নয়ন।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশের অন্যান্য জেলায় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইট উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও বান্দরবানে কেন তা করা হচ্ছে না? অথচ, একশ্রেণির অসাধু চক্র বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ কেটে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কেরানীহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় পাচার করছে। এতে একদিকে বান্দরবানের পরিবেশ ও পাহাড় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সেসব ভাটায় উৎপাদিত ইটই আবার দ্বিগুণ মূল্যে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে ইটভাটা বন্ধ রেখে পাহাড় ও পরিবেশের প্রকৃত সুরক্ষা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।

আরও পড়ুনঃ  দীঘিনালায় বাঘাইছড়ি জ্ঞানাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দান উপলক্ষে ০৩ জন গুনীজনকে মরনোত্তর সম্মাননা প্রদান

অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা—জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট আনতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে নির্মাণকাজের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অনেক সরকারি ঠিকাদারও বাড়তি খরচের কারণে সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারছেন না।

আরও পড়ুনঃ  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দাওয়াতি মাস উপলক্ষে ভোলায় সদস্যগ্রহণ ও দাওয়াতি কার্যক্রম

লামা উপজেলার বাসিন্দা মোঃ শাহাজান জানান, “নিজের একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হচ্ছে। ইটের মূল দামের চেয়ে গাড়িভাড়া আর শ্রমিক খরচই বেশি পড়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে সরকার যদি নিয়ম মেনে এখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাঁচবে।”
অন্য দিকে, ইটভাটা বন্ধ থাকার কারণে জেলাটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একটি ইটভাটাকে কেন্দ্র করে হাজারো শ্রমিক, গাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা নির্বাহ হতো। স্থানীয়ভাবে এই খাতটি বন্ধ থাকায় পার্বত্য অঞ্চলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, কাজের অভাবে অনেকে চরম অর্থনৈতিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন, এমনকি কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কর্মসংস্থান চাই, কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো কাজ আমরাও সমর্থন করি না।”

আরও পড়ুনঃ  মৌলভীবাজারে পূর্ববিরোধের জেরে এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টার ঘটনায় তুহিন আহমদ (৪৭) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এই অচলাবস্থার নিরসনে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একটি সমন্বিত টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে একটি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা জরুরি। আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির (যেমন স্বয়ংক্রিয় বা পরিবেশবান্ধব ইট) মাধ্যমে যদি সরকারি নজরদারিতে উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে একদিকে যেমন নির্মাণ ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জেলার অর্থনীতি সচল হবে।
প্রকৃতি ও পাহাড় রক্ষা করে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পাহাড়ের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা বান্দরবানবাসীর।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

সিলেটে শিরিন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ৪র্থ মেধাবৃত্তি পরীক্ষা সম্পন্ন

বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ: আকাশছোঁয়া নির্মাণ ব্যয়, ব্যাহত উন্নয়ন ও তীব্র কর্মসংস্থান সংকট

আপডেটের সময়: ১২:৩৮:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

মোঃরাসেল বিশেষ প্রতিনিধি: পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য জেলা বান্দরবানে স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদন বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলাটিতে কোনো ইটভাটা সচল না থাকায় সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই এখন তীব্র নির্মাণসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সম্পূর্ণভাবে পার্শ্ববর্তী জেলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় ইটের দাম ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যার ফলে থমকে গেছে গ্রামীণ অবকাঠামো ও আবাসন খাতের উন্নয়ন।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশের অন্যান্য জেলায় পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ইট উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও বান্দরবানে কেন তা করা হচ্ছে না? অথচ, একশ্রেণির অসাধু চক্র বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ কেটে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কেরানীহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় পাচার করছে। এতে একদিকে বান্দরবানের পরিবেশ ও পাহাড় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সেসব ভাটায় উৎপাদিত ইটই আবার দ্বিগুণ মূল্যে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে ইটভাটা বন্ধ রেখে পাহাড় ও পরিবেশের প্রকৃত সুরক্ষা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।

আরও পড়ুনঃ  বদলগাছীতে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ৮ হাজার কেজি চাল জব্দ

অনুসন্ধানে জানা যায়, বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা—জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর নির্মাণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট আনতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে নির্মাণকাজের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অনেক সরকারি ঠিকাদারও বাড়তি খরচের কারণে সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারছেন না।

আরও পড়ুনঃ  মেঘের ভেলায় ভাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম

লামা উপজেলার বাসিন্দা মোঃ শাহাজান জানান, “নিজের একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হচ্ছে। ইটের মূল দামের চেয়ে গাড়িভাড়া আর শ্রমিক খরচই বেশি পড়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে সরকার যদি নিয়ম মেনে এখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাঁচবে।”
অন্য দিকে, ইটভাটা বন্ধ থাকার কারণে জেলাটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একটি ইটভাটাকে কেন্দ্র করে হাজারো শ্রমিক, গাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা নির্বাহ হতো। স্থানীয়ভাবে এই খাতটি বন্ধ থাকায় পার্বত্য অঞ্চলের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, কাজের অভাবে অনেকে চরম অর্থনৈতিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন, এমনকি কেউ কেউ নিরুপায় হয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কর্মসংস্থান চাই, কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো কাজ আমরাও সমর্থন করি না।”

আরও পড়ুনঃ  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দাওয়াতি মাস উপলক্ষে ভোলায় সদস্যগ্রহণ ও দাওয়াতি কার্যক্রম

এই অচলাবস্থার নিরসনে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একটি সমন্বিত টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে একটি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা জরুরি। আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির (যেমন স্বয়ংক্রিয় বা পরিবেশবান্ধব ইট) মাধ্যমে যদি সরকারি নজরদারিতে উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে একদিকে যেমন নির্মাণ ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জেলার অর্থনীতি সচল হবে।
প্রকৃতি ও পাহাড় রক্ষা করে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পাহাড়ের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা বান্দরবানবাসীর।