
মোঃ সোহেল রানা, ঈশ্বরদী উপজেলা প্রতিনিধি (পাবনা)
বাড়তি খরচ ও কম দামে ঈশ্বরদীতে কমেছে শিমের আবাদ।ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় মাচান তৈরি করে শিম চাষ করছেন কৃষকরা। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারদর নিয়ে হতাশায় কমেছে আবাদ। একসময় শিম উৎপাদনের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ছিল পাবনার ঈশ্বরদী। চাহিদার কারণে ‘শিম চাষের রাজধানী’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল এলাকাটি। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া এবং কৃষি উপকরণ নিয়ে নানা সংকটে চলতি মৌসুমে সেই পরিচিত চিত্রে ভাটা পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৮০ হেক্টর কম জমিতে এবার শিম চাষ হচ্ছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে আবাদ হয়েছে প্রায় ৮১০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ কম জমিতে শিম চাষ হচ্ছে।কৃষকদের অভিযোগ, শিম উৎপাদনে খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী বাজারে দাম মিলছে না। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া, নিম্নমানের কৃষি উপকরণের ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত পরামর্শ না পাওয়ায় শিম চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।
উপজেলায় শিম উৎপাদনের প্রধান এলাকা মুলাডুলি ইউনিয়ন। কৃষি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদীর মোট শিম আবাদি জমির প্রায় ৮০ শতাংশ এই ইউনিয়নে। পতিরাজপুর, আড়কান্দি, নেকড়হাটা, মুলাডুলি, ফরিদপুর, রামেশ্বরপুর, শেখপাড়া, সড়াইকান্দি, বেতবাড়িয়া, রামনাথপুর, ডিলুহাট, বাঘহাছলা, বহরপুর ও দুর্গাপাড়াসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় শিম চাষ হয়।এছাড়া দাশুড়িয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর, দুর্গাবাজার, মারমী, কালিকাপুর দিঘীরপাড় এবং সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর, ভাড়ইমারী, নওদাপাড়া ও বক্তারপুর এলাকাতেও শিমের আবাদ রয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে মাচান তৈরি করে শিমগাছ বেড়ে উঠেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। কেউ শিমগাছের লতা ছাড়াচ্ছেন, কেউ অতিরিক্ত পাতা ছাঁটাই করছেন, আবার কেউ ফুল ও গাছের পরিচর্যা করছেন। তবে এত পরিচর্যার পরও অনেক জমিতে আশানুরূপ শিম ধরছে না বলে জানিয়েছেন চাষিরা।মুলাডুলি এলাকার কৃষক আশরাফুর ইসলাম দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে শিম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, জমি প্রস্তুত, বীজ বপন ও মাচান তৈরির কাজেই শুরুতে প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরপর সার ও বালাইনাশক কিনতেও নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে না পাওয়ার অভিযোগ করে আশরাফুর ইসলাম বলেন, ‘বছরে একদিনও তাদের দেখা পাওয়া যায় না। অথচ যোগাযোগ করলে তারা সবসময় কৃষকদের সেবা দিতে ব্যস্ত থাকার কথা বলেন। মাঠে যদি তাদের দেখা না পাই, তাহলে তারা কোন মাঠে থাকেন?’
কৃষক ইমরান বলেন, গাছে প্রয়োজনীয় সার ও বালাইনাশক প্রয়োগ করেও ফুল ঝরা বন্ধ করা যাচ্ছে না। কী কারণে ফুল ঝরে যাচ্ছে, সেটিও তারা বুঝতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বালাইনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
আরেক কৃষক আওয়াল জানান, তিনি প্রতিবছর প্রায় ১০ বিঘা জমিতে শিম চাষ করতেন। তবে কৃষি অফিসের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে কয়েক বছর ধরে তিনি শিম চাষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
কৃষক আফিলের অভিযোগ, বাজারে সরকারি সারের সংকট থাকায় অবৈধ ও নিম্নমানের সার এবং বালাইনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। এসব কৃষি উপকরণ কিনতে গিয়ে উৎপাদন খরচও বাড়ছে। নিম্নমানের সার ও বালাইনাশক বিক্রির অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।তবে কৃষকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও গরমের কারণে শিমের ফুল ঝরে যাচ্ছে।বাজারে বিক্রি হওয়া কীটনাশকগুলো সরকার অনুমোদিত বলেও দাবি করেন তিনি। তবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় বাজারে থাকা সার ও বালাইনাশকের গুণগত মান চাহিদা অনুযায়ী পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা।আব্দুল মমিন বলেন, বাজারে মানসম্পন্ন সার ও বালাইনাশকের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। শিগগিরই সংকট কেটে যাবে এবং কৃষকদের অভিযোগও থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের পাশাপাশি কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা ও মান, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শের ঘাটতিও শিম চাষে আগ্রহ কমার অন্যতম কারণ। ঈশ্বরদীর শিম চাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিবেদকের নাম 



















