
জিএম মাকছুদুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৯ নম্বর গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের পাঁচকুড়ী গ্রামে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমি থেকে অবাধে মাটি কাটার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। গ্রামটির মুন্সী বাড়ি (সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বাড়ির) দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ‘আনু মুন্সীর প্রজেক্ট’ থেকে বাবুল মিয়া নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। উপযুক্ত জরিমানা ও দৃশ্যমান কঠোর সাজা না থাকায় দীর্ঘ প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই অবৈধ ড্রেজার ব্যবসা অবাধে পরিচালনা করছেন বলে জানান ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে ভূগর্ভস্থ মাটি উত্তোলন করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের নেই কোন নজরদারি।
ড্রেজারের বিকট শব্দে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আশেপাশের বাসিন্দা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা একাধিকবার মাটি কাটায় বাধা দিলেও তা তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপটে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত বাবুল মিয়া। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক কৃষক আক্ষেপ করে জানান, আবাদি জমির তলদেশ থেকে গভীরভাবে মাটি তোলায় পার্শ্ববর্তী শত শত শতক ফসলি জমি ভেঙে ড্রেজারের গর্তে ধসে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে অনেক কৃষক স্থায়ীভাবে উপার্জনের পথ হারিয়ে ক্ষতির মুখে পড়লেও অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা বা লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, কৃষিজমি থেকে অবাধে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ড্রেজার দিয়ে ভূগর্ভস্থ মাটি উত্তোলন করা হলে ভূমির অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গঠনে মারাত্মক ধস নামে। মাটির গভীর থেকে পলি ও বালি তুলে নেওয়ার ফলে ভূগর্ভে একটি ফাঁপা বা শূন্যতার (Subsurface Void) সৃষ্টি হয়, যার কারণে পার্শ্ববর্তী কৃষিজমি স্থায়ীভাবে ধসে পড়তে পারে এবং ভূকম্পন ছাড়াই ভূমিস্বাত বা ধসের ঘটনা ঘটে।
এছাড়া, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটির সবচেয়ে উর্বর ওপরের স্তর বা ‘টপসয়েল’ নষ্ট হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে ওই জমির স্বাভাবিক ফসল ফলানোর ক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। ভূ-বিজ্ঞানীরা আরও সতর্ক করে বলেন যে, ধারাবাহিকভাবে মাটি কাটলে স্থানীয় ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং আশেপাশের নলকূপগুলোতে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। পাশাপাশি ড্রেজার চলার বিকট শব্দ ও অনবরত কম্পনের ফলে মাটির ভেতরের কণার বন্ধন দুর্বল হয়ে আশপাশের ঘরবাড়ি ও কাঠামোর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’-এর ৪ ধারা অনুযায়ী, উর্বর কৃষি জমি থেকে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ আইনের ১৫(১) ধারা অনুযায়ী এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম জব্দের স্পষ্ট নিয়মও রয়েছে। এছাড়া ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১২)’-এর ৬(খ) ধারা এবং ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬’ অনুযায়ী ড্রেজার দিয়ে অনবরত বিকট শব্দ সৃষ্টি করে পরিবেশ ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী অনতিবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার জব্দ, সব সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত ও মাটি উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধসহ অভিযুক্ত অপরাধীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে কঠোর সাজা নিশ্চিত করতে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
প্রতিবেদকের নাম 

















