
আব্দুল হালিম নিরব, ক্রাইম রিপোর্টার | চট্টগ্রাম
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় ডান্স ক্লাবের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে রমরমা নারী ব্যবসা। আর এই অন্ধকার সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে ‘ডান্স মাস্টার’ খ্যাত এক ব্যক্তি, যার নাম মুরাদ। নিজেকে কখনো পুলিশ, কখনো সাংবাদিক, আবার কখনো কোর্টের কর্মকর্তা বা মানবাধিকার কর্মী পরিচয় দিয়ে সে এই অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
সম্প্রতি এক নারীর সাথে মুরাদের একটি আপত্তিকর কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর থলথলে বেড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পতেঙ্গা এলাকাকে কেন্দ্র করে এক বিশাল নারী সাপ্লাইয়ের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে এই মুরাদ।
কল রেকর্ড ফাঁসে চাঞ্চল্য, থমকে গেছে পতেঙ্গা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ওই অডিও ক্লিপে মুরাদকে এক নারীর সাথে অনৈতিক চুক্তি এবং নিজের কথিত ক্ষমতার দাপট দেখাতে শোনা যায়। এই অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এরপরই অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তার দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময়ের অপরাধের খতিয়ান।
বহিরাগত মুরাদের ‘বহুরূপী’ নেটওয়ার্ক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডান্স মাস্টার মুরাদের দেশের বাড়ি চট্টগ্রাম না হলেও সে পতেঙ্গা এলাকাকে নিজের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে বা প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে সে প্রতিনিয়ত নিজের পরিচয় বদলায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুয়া পরিচয়: কখনো নিজেকে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সোর্স পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখায়।
ভুয়া সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী: কখনো কখনো গণমাধ্যমকর্মী বা মানবাধিকার নেতার কার্ড ঝুলিয়ে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করে।
নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট
মুরাদ একা নয়, তার এই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পতেঙ্গায় সক্রিয় রয়েছে একটি বিশাল সংঘবদ্ধ চক্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের সাথে জড়িয়ে রয়েছে:
কতিপয় নামধারী অনলাইন সাংবাদিক: যারা মুরাদের অপরাধের ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং কোনো সমস্যা হলে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের মুখ বন্ধ রাখে।
ভুঁইফোড় মানবাধিকার কর্মী: যারা অর্থের বিনিময়ে মুরাদকে আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার আশ্বাস দেয়।
স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নামধারী ব্যক্তি: স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের অসাধু নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় মুরাদ দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান,
“ডান্স শেখানোর নাম করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গরিব ও অসহায় মেয়েদের নিয়ে আসা হয়। পরে তাদের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এবং ব্ল্যাকমেইল করে এই দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়। এদের খুঁটির জোর এতো শক্ত যে, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।”
অভিযুক্ত ও প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ‘ডান্স মাস্টার’ মুরাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় বলেন, “আপনাদের কাছে যদি আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে আপনারা নিউজ (সংবাদ) করেন, কোনো সমস্যা নেই।”
এদিকে, পতেঙ্গা ও সংলগ্ন এলাকার এই অপরাধ সিন্ডিকেটের বিষয়ে ইপিজেড থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি)-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
একটি ডান্স ক্লাবের আড়ালে কীভাবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এমন জঘন্য অপরাধ সগৌরবে চলতে পারে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ। এই সংঘবদ্ধ চক্রের প্রধান ডান্স মাস্টার মুরাদ এবং তার পেছনের মদদদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে পতেঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে কলঙ্কমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবেদকের নাম 



















