Dhaka ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
যুব সমাজের আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জিটি গ্রুপের মতবিনিময় সভা: প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী পুতুল ডামুড্যায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বক্তব্যের প্রতিবাদে ভেদরগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ ইপিজেড থানা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি ঘোষণা: সভাপতি – আশরাফ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক ইমরান ফরিদপুরের নগরকান্দায় চরযশোরদী ইউনিয়নে লটারির মাধ্যমে নারী কর্মী নিয়োগ পবায় নিজ বাড়ির ছাদে ছুরিকাঘাতে কৃষক খুন কাশফুলে সেজেছে বাঁশখালীর গন্ডামারা, মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা গোবিন্দগঞ্জে ডিবির অভিযান, ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ একজন গ্রেপ্তার বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক ও গুণীজনদের মিলনমেলায় মুখরিত ধুনট মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের শেষ দিনে হিজলায় সংঘর্ষ, গুলিতে জেলে নিহত, আহত ৫ মানবপাচার ইয়াবা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় করণীয় শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা

মাঠের হাসি বাজারে গিয়ে মলিন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এবার চাষ, সার, পরিচর্যাসহ সবকিছুর খরচ বেশি সাড়ে ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ছিল। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ মণ। শ্রমিকের টাকা পরিশোধের জন্য ৯ মণ পেঁয়াজ হাটে বিক্রি করতে নিছিলাম। কিন্তু ৭০০ টাকা মণ দাম হওয়ায় ফেরত আনছি। এই দামে বিক্রি করলে লাভ দূরে থাক, খরচই উঠবে না! কৃষক বাঁচবে কী করে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের কৃষক জহির হোসেন। তাঁর ভাষ্য, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। বর্তমান পেঁয়াজের বাজারদরও একই। এতে লোকসানের শঙ্কা করছেন জহিরের মতো কৃষকরা। তারা বলছেন, এবার চাষ, সার, পরিচর্যাসহ সবকিছুর খরচ বেশি লাগেছে। খরচ বাড়লেও পেঁয়াজের ফলন গতবারের চেয়ে বেশি হওয়ায় কৃষকরা খুশি। কিন্তু দামে অখুশি তারা।

 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালীতে গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চার হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেন কৃষকরা। ভালো আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে ২১ থেকে ২২ টন হিসাবে মোট এক লাখ তিন হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২৯ মার্চ সকালে যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর, বাগুলাট ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ থেকে সাতজন দল বেঁধে জমি থেকে পেঁয়াজ তুলছেন। সেগুলো আবার কেউ বস্তা ভরে ভ্যান, অটো, ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়িতে নিচ্ছেন। আর নারীরা পেঁয়াজের গাছ কাটাকাটি করছেন ৪০ টাকা মণ চুক্তিতে। যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের কৃষক বদর উদ্দিন বলেন, ‘একটা লেবারের (শ্রমিক) দাম ৭০০ টাকা। আরও টানে নিয়ে যাতি হচ্ছে ভ্যান ভাড়া দিয়ে। এরপর ৭০০ টাকা করে পেঁয়াজ! এতে কি লাভ হয়? ১৫০০, দুই হাজার টাকা হলেও বাঁচা যেত।

আরও পড়ুনঃ  এক মহল্লায় তিন মেয়র প্রার্থী নিয়ে গ্যাঁড়াকলে সমর্থকরা

 

আরেক কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘বিঘায় জমি ভাড়া, সার, ফাস, চাষ, জন দিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ৮০ মণ ফলন হয়েছে। ফলনে খুশি। কিন্তু দামে তো খুশি না। বাইরের আমদানি বন্ধ করে সরকারকে অবশ্যই দাম বাড়ানো উচিত। চাপড়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলাম পড়াশোনা শেষ করে আধুনিক কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন। চলতি মৌসুমে প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের চাষ করেছেন তিনি। মনিরুল বলেন, ‘মাত্র তিন বিঘা জমির পেঁয়াজ তোলা হয়েছে। গড়ে ১০০-১২০ মণ ফলন হচ্ছে। দাম না থাকায় চিন্তায় পড়েছি। প্রতি রোববার পান্টি-যদুবয়রা সড়কের চৌরঙ্গী কলেজ মাঠে বসে সাপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট। সরেজমিন দেখা যায়, হাটে বেচা-বিক্রি শেষ। ব্যবসায়ীরা কেনা পেঁয়াজ নিজ গন্তব্যে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাটে আসা চাঁদপুর ইউনিয়নের মহননগর গ্রামের ব্যবসায়ী কুরবান আলী বলেন, ৮০ বস্তায় ১৬০ মণের মতো পেঁয়াজ কিনেছি। প্রতি মণ পেঁয়াজ মানভেদে ৬৫০-৮০০ টাকায় কেনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বাজারে আমদানি বেশি হওয়ায় গতবারের তুলনায় দাম অর্ধেক।

 

হাট পরিচালনা কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, রোববার বাজারে প্রায় দুই হাজার মণ পেঁয়াজের আমদানি হয়েছিল। এবার উৎপাদন বেশি, বাজারে আমদানিও বেশি। এ ছাড়া মুড়িকাটা পেঁয়াজ এখনও বাজারে আসছে। সেজন্য দাম খুবই কম। বাধ্য হয়ে কৃষকরা লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টরে ২১ থেকে ২২ টন হিসাবে মোট এক লাখ তিন হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান বাজার অনুযায়ী কৃষকের লোকসান হচ্ছে না। তবে লাভ কম হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার মনিটর করা হচ্ছে।

 

দুশ্চিন্তায় ফরিদপুরের চাষিরা
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরে মাঠ থেকে হালি পেঁয়াজ ওঠানো শুরু হয়েছে। লালতি, হাফিজ কিং, আফগান হাইব্রিডসহ বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছেন চাষিরা। এ বছর ফলন ভালো হলেও ৭০০-৮০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করে লোকসানের মুখে তারা। প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদানে ৪০ টাকার বেশি খরচ হলেও বর্তমানে ২০ টাকা দরে বিক্রি করায় অর্ধেকের বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুরে গত বছরের তুলনায় সাত হাজার হেক্টরের বেশি জমিসহ হালি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ৪৭ হাজার ৫০০ হেক্টর, যা থেকে উৎপাদন হয়েছে ছয় লাখ ৮২ হাজার টন।

আরও পড়ুনঃ  নির্মাণের নয় বছর তালাবদ্ধ বরিশাল শিশু হাসপাতাল

 

বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দরে। কৃষকরা বলছেন, অন্তত দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারতেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজের প্রভাবের কারণে দেশীয় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। এতে মাঠ পর্যায়ের চাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ শ্রমিক খরচে বেড়েছে হালি পেঁয়াজ উৎপাদনের ব্যয়। কৃষকদের দাবি, বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। ফরিদপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে পেঁয়াজের দাম কৃষকদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। তাই কৃষক ও ভোক্তার কথা মাথায় রেখে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি পেঁয়াজের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হলে কৃষক লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে ভারসাম্য না থাকায় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। কৃষকদের ক্ষতি কমাতে সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, বাজার তদারকি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। আড়তদাররা বিক্রি করছেন ইচ্ছামতো দামে
‘পেঁয়াজের ভান্ডার’খ্যাত এলাকা হিসেবে পরিচিত পাবনার বেড়া, সুজানগর ও সাঁথিয়ার কৃষকরা চলতি বছর ব্যাপকভাবে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দেশের মোট চাহিদার এক-অষ্টমাংশ চাহিদা পূরণ হয় এসব উপজেলায় উৎপাদনের মাধ্যমে। এ ছাড়া দেশে যত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তার ১০ শতাংশ পেঁয়াজ সাঁথিয়ায় উৎপাদন হয়। অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বাজারদর কম হওয়ায় হাসি নেই কৃষকের মুখে। শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন খরচ বেশি। কিন্তু কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এদিকে পাবনার বিভিন্ন বাজারে আড়তদাররা ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করছেন ইচ্ছামতো দামে।

আরও পড়ুনঃ  বদলির দুই মাস পরও অবমুক্ত নন সাজেদুল, কার্যকর হচ্ছে না ভূমি সংস্কার বোর্ডের আদেশ?

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র জানায়, এ বছর ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ ৪৫০ হাজার টন। তবে উৎপাদন ৯ লাখ টন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সাঁথিয়া কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এ উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে হালি বা চারা পদ্ধতির পেঁয়াজ এবং এক হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, প্রতি বিঘায় পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা। সাঁথিয়ার পাইকারি পেঁয়াজের হাট বোয়াইলমারী, করমজা চতুরহাট, বনগ্রাম, কাশিনাথপুর, আতাইকুলা, ধুলাউড়ি হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মণ ছোট পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় এবং একটু বড় আকারের পেঁয়াজ ৯০০ টাকায়। কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষকরা। সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, এখন পেঁয়াজ ঘরে তোলার মৌসুম। সে কারণে হাটে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কম। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে দাম বাড়বে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

যুব সমাজের আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জিটি গ্রুপের মতবিনিময় সভা: প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী পুতুল

মাঠের হাসি বাজারে গিয়ে মলিন

আপডেটের সময়: ০৪:১৫:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এবার চাষ, সার, পরিচর্যাসহ সবকিছুর খরচ বেশি সাড়ে ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ছিল। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ মণ। শ্রমিকের টাকা পরিশোধের জন্য ৯ মণ পেঁয়াজ হাটে বিক্রি করতে নিছিলাম। কিন্তু ৭০০ টাকা মণ দাম হওয়ায় ফেরত আনছি। এই দামে বিক্রি করলে লাভ দূরে থাক, খরচই উঠবে না! কৃষক বাঁচবে কী করে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের কৃষক জহির হোসেন। তাঁর ভাষ্য, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। বর্তমান পেঁয়াজের বাজারদরও একই। এতে লোকসানের শঙ্কা করছেন জহিরের মতো কৃষকরা। তারা বলছেন, এবার চাষ, সার, পরিচর্যাসহ সবকিছুর খরচ বেশি লাগেছে। খরচ বাড়লেও পেঁয়াজের ফলন গতবারের চেয়ে বেশি হওয়ায় কৃষকরা খুশি। কিন্তু দামে অখুশি তারা।

 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালীতে গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চার হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেন কৃষকরা। ভালো আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে ২১ থেকে ২২ টন হিসাবে মোট এক লাখ তিন হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ২৯ মার্চ সকালে যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর, বাগুলাট ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ থেকে সাতজন দল বেঁধে জমি থেকে পেঁয়াজ তুলছেন। সেগুলো আবার কেউ বস্তা ভরে ভ্যান, অটো, ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়িতে নিচ্ছেন। আর নারীরা পেঁয়াজের গাছ কাটাকাটি করছেন ৪০ টাকা মণ চুক্তিতে। যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের কৃষক বদর উদ্দিন বলেন, ‘একটা লেবারের (শ্রমিক) দাম ৭০০ টাকা। আরও টানে নিয়ে যাতি হচ্ছে ভ্যান ভাড়া দিয়ে। এরপর ৭০০ টাকা করে পেঁয়াজ! এতে কি লাভ হয়? ১৫০০, দুই হাজার টাকা হলেও বাঁচা যেত।

আরও পড়ুনঃ  সালাহউদ্দিন সাহেব সব মন্ত্রণালয়ের পারদর্শী লোক: বিরোধীদলীয় নেতা

 

আরেক কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘বিঘায় জমি ভাড়া, সার, ফাস, চাষ, জন দিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ৮০ মণ ফলন হয়েছে। ফলনে খুশি। কিন্তু দামে তো খুশি না। বাইরের আমদানি বন্ধ করে সরকারকে অবশ্যই দাম বাড়ানো উচিত। চাপড়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলাম পড়াশোনা শেষ করে আধুনিক কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন। চলতি মৌসুমে প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের চাষ করেছেন তিনি। মনিরুল বলেন, ‘মাত্র তিন বিঘা জমির পেঁয়াজ তোলা হয়েছে। গড়ে ১০০-১২০ মণ ফলন হচ্ছে। দাম না থাকায় চিন্তায় পড়েছি। প্রতি রোববার পান্টি-যদুবয়রা সড়কের চৌরঙ্গী কলেজ মাঠে বসে সাপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট। সরেজমিন দেখা যায়, হাটে বেচা-বিক্রি শেষ। ব্যবসায়ীরা কেনা পেঁয়াজ নিজ গন্তব্যে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাটে আসা চাঁদপুর ইউনিয়নের মহননগর গ্রামের ব্যবসায়ী কুরবান আলী বলেন, ৮০ বস্তায় ১৬০ মণের মতো পেঁয়াজ কিনেছি। প্রতি মণ পেঁয়াজ মানভেদে ৬৫০-৮০০ টাকায় কেনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বাজারে আমদানি বেশি হওয়ায় গতবারের তুলনায় দাম অর্ধেক।

 

হাট পরিচালনা কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, রোববার বাজারে প্রায় দুই হাজার মণ পেঁয়াজের আমদানি হয়েছিল। এবার উৎপাদন বেশি, বাজারে আমদানিও বেশি। এ ছাড়া মুড়িকাটা পেঁয়াজ এখনও বাজারে আসছে। সেজন্য দাম খুবই কম। বাধ্য হয়ে কৃষকরা লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রতি হেক্টরে ২১ থেকে ২২ টন হিসাবে মোট এক লাখ তিন হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান বাজার অনুযায়ী কৃষকের লোকসান হচ্ছে না। তবে লাভ কম হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার মনিটর করা হচ্ছে।

 

দুশ্চিন্তায় ফরিদপুরের চাষিরা
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরে মাঠ থেকে হালি পেঁয়াজ ওঠানো শুরু হয়েছে। লালতি, হাফিজ কিং, আফগান হাইব্রিডসহ বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছেন চাষিরা। এ বছর ফলন ভালো হলেও ৭০০-৮০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করে লোকসানের মুখে তারা। প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদানে ৪০ টাকার বেশি খরচ হলেও বর্তমানে ২০ টাকা দরে বিক্রি করায় অর্ধেকের বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুরে গত বছরের তুলনায় সাত হাজার হেক্টরের বেশি জমিসহ হালি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ৪৭ হাজার ৫০০ হেক্টর, যা থেকে উৎপাদন হয়েছে ছয় লাখ ৮২ হাজার টন।

আরও পড়ুনঃ  বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানি ফাউন্ডেশনের প্রতি ডা. জুবাইদার আহ্বান

 

বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা দরে। কৃষকরা বলছেন, অন্তত দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারতেন। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজের প্রভাবের কারণে দেশীয় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। এতে মাঠ পর্যায়ের চাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাছাড়া বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ শ্রমিক খরচে বেড়েছে হালি পেঁয়াজ উৎপাদনের ব্যয়। কৃষকদের দাবি, বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। ফরিদপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে পেঁয়াজের দাম কৃষকদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। তাই কৃষক ও ভোক্তার কথা মাথায় রেখে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি পেঁয়াজের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হলে কৃষক লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহে ভারসাম্য না থাকায় পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। কৃষকদের ক্ষতি কমাতে সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, বাজার তদারকি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। আড়তদাররা বিক্রি করছেন ইচ্ছামতো দামে
‘পেঁয়াজের ভান্ডার’খ্যাত এলাকা হিসেবে পরিচিত পাবনার বেড়া, সুজানগর ও সাঁথিয়ার কৃষকরা চলতি বছর ব্যাপকভাবে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দেশের মোট চাহিদার এক-অষ্টমাংশ চাহিদা পূরণ হয় এসব উপজেলায় উৎপাদনের মাধ্যমে। এ ছাড়া দেশে যত পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তার ১০ শতাংশ পেঁয়াজ সাঁথিয়ায় উৎপাদন হয়। অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বাজারদর কম হওয়ায় হাসি নেই কৃষকের মুখে। শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন খরচ বেশি। কিন্তু কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এদিকে পাবনার বিভিন্ন বাজারে আড়তদাররা ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করছেন ইচ্ছামতো দামে।

আরও পড়ুনঃ  চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ৭ মাসের পরোয়ানাভুক্ত মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের মূল হোতা ‘মালা ভাবি’ গ্রেপ্তার

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র জানায়, এ বছর ৫৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আবাদ হয়েছে ৫৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ ৪৫০ হাজার টন। তবে উৎপাদন ৯ লাখ টন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সাঁথিয়া কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এ উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে হালি বা চারা পদ্ধতির পেঁয়াজ এবং এক হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, প্রতি বিঘায় পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা। সাঁথিয়ার পাইকারি পেঁয়াজের হাট বোয়াইলমারী, করমজা চতুরহাট, বনগ্রাম, কাশিনাথপুর, আতাইকুলা, ধুলাউড়ি হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মণ ছোট পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় এবং একটু বড় আকারের পেঁয়াজ ৯০০ টাকায়। কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষকরা। সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, এখন পেঁয়াজ ঘরে তোলার মৌসুম। সে কারণে হাটে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা কম। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে দাম বাড়বে।